স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অকশন ডিপার্টমেন্টের ‘অপারেশন ম্যানেজার’ পরিচয় দিয়ে নিলামের কম মূল্যে আইফোন, স্যামসাং মোবাইল ও ল্যাপটপসহ দামি ইলেকট্রনিক্স পণ্য সরবরাহের প্রলোভনে প্রায় ৩১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ৫ জুলাই দিবাগত মধ্যরাতে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার কমিশনার গলি এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম মো. ইব্রাহিম হোসেন ওরফে রবিন শিকদার (২৮)। তিনি ঢাকার ডেমরা থানার সারুলিয়া এলাকার মো. মোস্তফার ছেলে। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত একটি আইফোনসহ ৫টি দামি মোবাইল ও ৭টি সক্রিয় সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও সিআইডি সূত্র জানায়, এই চক্রের মূল শিকার হয়েছেন ঢাকার একটি বেসরকারি জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত এক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা। প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে নিজেদের বিমানবন্দরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তারা দাবি করে যে, তাদের অধীনে কর্মরত প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ওই জীবনবীমা প্রতিষ্ঠান থেকে পলিসি গ্রহণে অত্যন্ত আগ্রহী। এই সুবাদে ভুক্তভোগীর সাথে একটি নিবিড় ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক গড়ে তোলে ইব্রাহিম। একপর্যায়ে তারা ভুক্তভোগীকে বিমানবন্দরের অকশনে জব্দকৃত বা অব্যবহৃত পণ্য কিনে ইলেকট্রনিক্স ব্যবসার বড় অংশীদার হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দেয়।
ব্যবসার সত্যতা ও বৈধতা প্রমাণের জন্য চক্রটি সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি)-এর ভুয়া ডকুমেন্ট, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি জাল অনুমোদনপত্র, কথিত সরকারি নথি এবং জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সরবরাহ করে। এসব নিখুঁত জাল কাগজপত্র দেখে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা সরল বিশ্বাসে বিনিয়োগ করতে রাজি হন। এরপর ১১০টি আইফোন, ৭০টি স্যামসাং মোবাইল এবং ৫৪৩টি ল্যাপটপ সরবরাহের কথা বলে বিভিন্ন ধাপে ২টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোট ৩০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। টাকা পাওয়ার পর তারা পণ্য সরবরাহ না করে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা গত ২২ জুন ডিএমপির পল্টন থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা (মামলা নং- ৩৩) দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সিপিসির তথ্য-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই সুপরিকল্পিত প্রতারণার সঙ্গে ইব্রাহিম হোসেন ওরফে রবিন সিকদারের সরাসরি সম্পৃক্ততার সত্যতা পাওয়া যায়।
সিআইডি জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছে। ইব্রাহিম ডিএমপির ভাটারা থানার অপর একটি ডিজিটাল প্রতারণা মামলারও চার্জশিটভুক্ত এজাহারনামীয় আসামি এবং মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য সদস্য, ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে এবং তাদের গ্রেফতারে সিআইডির বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
এদিকে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রির অনলাইন প্রলোভন, অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া ব্যবসায়িক প্রস্তাব কিংবা ভুয়া সরকারি কাগজপত্রে বিশ্বাস করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য দেশের সাধারণ জনগণকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছে সিআইডি। যেকোনো বড় বিনিয়োগ বা ক্রয়ের আগে সংশ্লিষ্ট মূল প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করার এবং কোনো সন্দেহজনক ঘটনা ঘটলে দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।


