বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া :
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় এক ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চালক তরুণকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আন্তঃজেলা অপহরণকারী চক্রের ৩ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কলাপাড়া থানা পুলিশের ধারাবাহিক ও শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে অপহৃত যুবককে জীবিত উদ্ধারের পাশাপাশি তাঁর ব্যবহৃত অটোভ্যান ও দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। গত রবিবার ও সোমবার (১৫ জুন) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে চক্রের এই সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।আহত ও অপহৃত চালকের নাম মো. রাফি খান (১৯)। তিনি মহিপুর উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের তারিকাটা এলাকার বাসিন্দা মো. হাসানের ছেলে। বর্তমানে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত নিয়ে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুন অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা যাত্রী সেজে কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘোরার জন্য রাফির অটোভ্যানটি ভাড়া করে। দিনভর ভ্রমণের পর চালকের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে পরদিন আবারও গাড়ি ভাড়া নেওয়ার কথা বলে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি সংগ্রহ করে দুর্বৃত্তরা।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, পরদিন ১৪ জুন সকালে অভিযুক্তরা ফোন করে রাফিকে কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হাজীপুর ব্রিজ সংলগ্ন আবুল কাশেম জামে মসজিদের সামনে আসতে বলে। সরল বিশ্বাসে রাফি সেখানে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে তাঁকে জোরপূর্বক একটি অজ্ঞাত ও নির্জন স্থানে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
অপহরণের পর রাফিকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে চক্রটি। পরে তাঁর পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়, অন্যথায় রাফিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একমাত্র সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আকুতিতে রাফির অসহায় পিতা মো. হাসান প্রাথমিক কিস্তি হিসেবে অপহরণকারীদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠান। তবে বাকি সাড়ে ৪ লাখ টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি ও নির্যাতন বাড়তে থাকলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কলাপাড়া থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কলাপাড়া থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মাঠে নামে। রাতেই কলাপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত মো. জাহিদ প্যাদা ও মো. ইমরান গাজীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁদের দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে চাকামইয়া ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া এলাকায় দ্বিতীয় দফা অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অপহৃত রাফি খানকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং অপর অপহরণকারী মো. কোয়েল গাজীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া রাফি খান হাসপাতালে জানান, অপহরণকারীরা তাঁকে একটি অন্ধকার ঘরে শিকলবন্দি করে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করছিল এবং তাঁদের মূল লক্ষ্যই ছিল মুক্তিপণ আদায় করা। এ ঘটনায় রাফির পিতা মো. হাসান বাদী হয়ে কলাপাড়া থানায় অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির সুনির্দিষ্ট ধারায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশের দ্রুত ও কৌশলী তৎপরতার কারণে একটি বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং ভুক্তভোগীকে নিরাপদে উদ্ধার করা গেছে। গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের সাথে সিন্ডিকেটের আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের গভীর তদন্ত এবং সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ছবি পাঠিয়েছেন বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু।


