স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
প্রবাদ আছে, “আইন রক্ষাকর্তা যদি সদিচ্ছা রাখেন, তবে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা স্রেফ সময়ের ব্যাপার।” এই প্রবাদের বাস্তব রূপ যেন দেখালেন যশোর উপশহর পুলিশ ক্যাম্পের বর্তমান ইনচার্জ অলক কুমার দে (পিপিএম)। উপশহর পুলিশ ফাঁড়িতে যোগদানের মাত্র ২২ দিনে তিনি পাল্টে দিয়েছেন পুরো এলাকার চেনা প্রেক্ষাপট। তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব ও ঝটিকা পুলিশি তৎপরতায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেট, কোণঠাসা হয়ে পড়েছে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজেরা। প্রাণভয়ে অনেক অপরাধী এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে, আবার কেউ কেউ চিরতরে অপরাধের পথ ছেড়ে দেওয়ার মুচলেকা দিচ্ছে। মাত্র তিন সপ্তাহে তিনি যেন উপশহরবাসীর কাছে এক পরম আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের নাম হয়ে উঠেছেন।
২২ দিনে ৬২ মামলা: মোবাইল কোর্টের সাঁড়াশি অ্যাকশন
ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, অলক কুমার দে যোগদানের পর থেকে অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেন। গত ২২ দিনে তিনি মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী এবং পাতি-সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে রেকর্ড সংখ্যক ৬২টি মামলা রুজু করেছেন। শুধু মামলাই নয়, ধৃতদের তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতে (মোবাইল কোর্ট) হাজির করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর এই তড়িৎ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার কারণে এলাকায় মাদক সেবন ও প্রকাশ্য আড্ডাবাজি শতভাগের কাছাকাছি কমে এসেছে।
একে একে খাঁচায় বন্দি শীর্ষ ৪ ডন ও সন্ত্রাসী
উপশহর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করা একাধিক চিহ্নিত অপরাধীকে আইনের আওতায় এনেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর উল্লেখযোগ্য সফল অভিযানের মধ্যে রয়েছে:
চাঁদাবাজ মেহেদি গ্রেপ্তার: দীর্ঘদিন ধরে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের পথ আটকে টাকা-পয়সা, মোবাইল কেড়ে নেওয়া এবং জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা উপশহরের চিহ্নিত চাঁদাবাজ মেহেদিকে তার প্রধান সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছেন।
পাগলাদহের আতঙ্ক শহীদ ও আসাদ : পাগলাদহ এলাকার সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম করে দেওয়া দুই মূর্তিমান আতঙ্ক ‘শহীদ’ ও ‘আসাদ’-কে বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করেছেন।
শীর্ষ মাদক সম্রাট খোঁড়া হাসান আটক: কিসমত নোয়াপাড়া এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ‘খোঁড়া হাসান’কে বিপুল মাদকসহ জালে তুলেছে তিনি।
বাঙালি শহীদ গ্রেপ্তার: বিরামপুর এলাকার মাদকের গডফাদার ও কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী ‘বাঙালি শহীদ’কে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছেন তিনি।।
আধুনিক পুলিশিং: ‘হোন্ডা মোবাইল ডিউটি’ প্রবর্তন
রাত্রিকালীন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উপশহরবাসীকে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা উপহার দিয়েছেন অলক কুমার দে। প্রথাগত পুলিশিংয়ের বাইরে গিয়ে তিনি রাত্রিকালীন বড় বড় টহল গাড়ির পাশাপাশি ‘হোন্ডা মোবাইল ডিউটি’ (মোটরসাইকেল টহল) প্রবর্তন করেছেন। এর ফলে উপশহরের চিপা-গলি বা অন্ধকার পকেট এলাকাগুলোতেও মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ পৌঁছে যাচ্ছে। এই ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’-এর কারণে গভীর রাতেও সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন।
ভুতুড়ে পরিবেশ থেকে দৃষ্টিনন্দন ফাঁড়ি
আজ থেকে ঠিক এক মাস আগেও যশোর উপশহর পুলিশ ফাঁড়িটি ছিল অবহেলিত, স্থানীয়দের ভাষায় যা ছিল একটি ‘ভুতুড়ে বাড়ি’। রাতে দূর থেকে চেনার উপায় ছিল না যে এটি একটি পুলিশ ফাঁড়ি। কিন্তু অলক কুমার দে দায়িত্ব নেওয়ার পর অবয়ব বদলে গেছে ক্যাম্পের। এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে চমৎকার দৃষ্টিনন্দন ডিজিটাল সাইনবোর্ড, পুরো ফাঁড়ি চত্বর মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জায়। একটি পূর্ণাঙ্গ ও আদর্শ থানার রূপ পেয়েছে এই ফাঁড়িটি, যা দেখে পথচারী ও এলাকাবাসী প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
প্রশংসায় ভাসছেন ডিবি’র সেই সফল ট্র্যাকার
উপশহরের সাধারণ মানুষ জানান, এখন ফাঁড়িতে কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলে কোনো দালালের খপ্পরে পড়তে হয় না। ইনচার্জ নিজেই ভুক্তভোগীদের কথা শুনছেন এবং তড়িৎ গতিতে অ্যাকশন নিচ্ছেন। সমাজবিরোধীরা তাঁর ওপর নারাজ হলেও সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
উল্লেখ্য, অলক কুমার দে পিপিএম এর আগে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) কর্মরত থাকাকালীন সময়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। সে সময় বহু চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস (সূত্রহীন) হত্যা মামলার সমাধান, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল মাদক জব্দ এবং দুর্ধর্ষ আসামিদের দক্ষতার সাথে গ্রেপ্তার করে একাধিকবার বিভাগীয় ও জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ডিবি’র সেই চনমনে ও পেশাদার অভিজ্ঞতাকেই তিনি এখন উপশহরবাসীর শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজে লাগাচ্ছেন। এলাকাবাসীর দাবি, অলক কুমারের মতো সৎ ও সাহসী কর্মকর্তার হাত ধরেই গড়ে উঠবে মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও স্মার্ট বাংলাদেশ।


