মোঃ মাসুদ রানা, ঝিনাইদহ:
কম্বোডিয়ায় পাচারের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো দুই প্রবাসীর মানবপাচার মামলায় খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চরম জালিয়াতি, জালিয়াতি মূলে স্বাক্ষর নকল ও ঘুষ না পেয়ে আসামিদের বাঁচানোর বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইদহে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন ঘটনার অভিযুক্ত কর্মকর্তা হরিণাকুণ্ডু থানার সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) মোঃ নাহিদুর রহমান।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অনৈতিক সুবিধা ও ঘুষের মোটা অঙ্কের টাকা না পেয়ে ওই কর্মকর্তা বাদী এবং সাক্ষীদের ভুয়া ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে আদালতে সম্পূর্ণ বানোয়াট এক চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করেছেন। এই ঘটনার প্রতিকার ও অভিযুক্ত অফিসারের কঠোর শাস্তির দাবিতে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রেসক্লাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, উপজেলার ফলসি গ্রামের মোশাররফ হোসেনের ছেলে মোঃ হাবিবুল্লাহ বাশার এবং একই এলাকার রাশেদুল ইসলামকে ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির প্রলোভন দিয়ে নিয়ে যায় স্থানীয় কুলবাড়িয়া গ্রামের শরিফুল জোয়ারদার, তার স্ত্রী জলি বেগম ও ছেলে সাজিদ জোয়ারদার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি ‘চাইনিজ ব্ল্যাক ক্যাসিনো’ কোম্পানিতে বিক্রি করে জিম্মি ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে তাদের স্বজনদের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দিলে তারা দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে প্রবাসীরা বিজ্ঞ মানব পাচার দমন ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা করলে আদালতের নির্দেশে গত ৬ মে হরিণাকুণ্ডু থানায় দু’টি নিয়মিত মামলা (মামলা নং- ০৭/২৬ ও ১১/২৬) রজু করা হয়।
মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর এসআই নাহিদুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে সঠিক প্রতিবেদন দেওয়ার শর্তে বাশার ও রাশেদুলের নিকট আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ প্রবাসীদের (যে সম্পর্কিত একটি কল রেকর্ডও সংরক্ষিত আছে)। বাদীরা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে এবং আসামিদের সাথে আপস করতে রাজি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৩০ জুন আদালতে আসামিদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বানোয়াট ফাইনাল রিপোর্ট দেন ওই কর্মকর্তা। ফলে রিপোর্ট জমার দিনই আসামিরা আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়।
প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তার বেশ কিছু চতুরতা ও ভুল তথ্য উঠে আসে। দুই প্রবাসী একই ফ্লাইটে পাশাপাশি সিটে দেশে ফিরলেও প্রতিবেদনে ইচ্ছেকৃতভাবে সিট নম্বরে গরমিল করা হয়। এমনকি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত বিজ্ঞপ্তিতে বাদী রাশেদুল ও তিন সাক্ষী— হাফিজ, মিন্টু ও মিল্টনের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সাক্ষী মিল্টনের বাবার নাম পরিবর্তন করে ভুল তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই মোঃ নাহিদুর রহমান আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবির কথা অস্বীকার করলেও আসামি ধরার নামে অর্থ চাওয়ার কল রেকর্ডের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
তবে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখার কথা জানিয়ে স্পষ্ট বলেছেন, “অভিযোগটি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিবিশেষের কোনো অনৈতিক দায়ের ভার পুরো পুলিশ বিভাগ নেবে না; পুলিশে কোনো অন্যায়ের স্থান নেই।” ছবি সংগৃহীত।


