এইচএসসি পাসেই ‘প্রফেসর-ডক্টর’! শেখ হাসিনার পর এবার জামায়াত আমির!

এইচএসসি পাসেই ‘প্রফেসর-ডক্টর’! শেখ হাসিনার পর এবার জামায়াত আমির!

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :

ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি বাঁকে গিরগিটির মতো রং পাল্টে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলকে বুড়ো আঙুল দেখানো এক মহাপ্রতারকের নাম মাহামুদুল হাসান। যার প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ শিক্ষা বলতে কেবল ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস! অথচ নামের আগে অবলীলায় লাগিয়েছেন ‘প্রফেসর’ ও ‘ডক্টরেট’ তকমা। এই ভুয়া পরিচয়েই তিনি দেশের নর্থ সাউথ ও এআইইউবি (AIUB)-এর মতো নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতাও করেছেন। ক্ষমতার শীর্ষ স্তরে জায়গা পেতে কখনো বনে গেছেন কট্টর আওয়ামী লীগার ও শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’, আবার ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ‘পররাষ্ট্র উপদেষ্টা’র পদও বাগিয়ে নেন এই বাজিকর। তবে আভিজাত্যের এই চটকদার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিকৃত ও নৃশংস অপরাধীর চেহারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-তে ভর্তি হলেও কোর্স শেষ করেননি মাহামুদুল। সেখানে শুরু করেন ভর্তি বাণিজ্য। এরপর তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। যুক্তরাজ্যে গিয়েই তাঁর জালিয়াতি আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। ২০০৯ সালের দিকে এই ভয়াবহ জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়ায় মাহামুদুলের ওপর যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান’ জারি করে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাজ্য থেকে বিতাড়িত মাহামুদুল দ্রুত নিজের রাজনৈতিক রং বদলে ফেলেন। নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ পরিচয় দিয়ে দেশে এক নতুন প্রতারণার জাল পাতেন। ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি ভুঁইফোঁড় এনজিও খুলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিদেশি প্রতিনিধিদের মেইল পাঠিয়ে বৈঠকের সময় বের করতেন। পরবর্তী সময়ে গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে এবং বিভিন্ন স্থানে র‍্যাব মহাপরিচালকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ভুয়া লোকেশন ও ছবি এডিট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে নিজেকে ‘ভিআইপি’ হিসেবে জাহির করতেন। এই ফেসবুক আভিজাত্যকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মহলের সঙ্গে লবিং করে বড় অঙ্কের অর্থবাণিজ্য করতেন তিনি। ২০১২-১৩ সালে এআইইউবি-তে গেস্ট টিচার থাকাকালীন ডিজিএফআই ও এসএসএফ-এর কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে লবিং ও ব্ল্যাকমেইলিং করার চেষ্টার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।

এই কাল্পনিক ‘ভিআইপি’র বিকৃত মানসিকতার সবচেয়ে নৃশংস শিকার হয়েছেন নিরীহ নারীরা। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ১৫ বছরের এক কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণের দায়ে মিরপুর থানা পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট (নং-৩১৬, তারিখ: ২৭/৮/২০২০) জমা দিয়েছিল এবং তিনি বেশ কয়েক মাস জেলও খাটেন। পরে শেখ হাসিনার উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সাক্ষীদের আদালতে যেতে বাধা দিলে বিচারক তাকে খালাস দেন। এছাড়া নিজের বিকৃত মানসিকতার আড়াল করতে ১৬ বছরের প্রথম সন্তান, সাবেক স্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে র‍্যাব-পুলিশের মাধ্যমে বছরের পর বছর জিম্মি ও হয়রানি করেছেন। ৫ আগস্টের পর এসবির (SB) কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সাবেক স্ত্রী ও সন্তানের পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে এখনো ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছেন এই প্রতারক।

অন্য এক স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার ভুয়া মানহানির মামলা ঠুকে দিয়ে মাহামুদুল আদালতে দাবি করেছেন—তিনি নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক ঋণ নীতিমালা, পররাষ্ট্র, এনবিআর, সংবিধান ও পুলিশসহ ২০টি সংস্কার কমিটির নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছেন! অথচ বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করেছে মাত্র ১১টি। এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এই নামের কাউকে চিনি না, ব্যক্তিগতভাবে উনার সাথে কাজ করার প্রশ্নই আসে না।”

৫ আগস্টের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে লবিং করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে মাহামুদুল সর্বশেষ আশ্রয় নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। চতুরতার আশ্রয় নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে নেন। কিন্তু জামায়াত আমিরের অনুমতি না নিয়ে নিজেকে ‘মন্ত্রী পদমর্যাদায়’ নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করে নিজেই দলীয় প্যাডে চিঠি পাঠান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে! বিষয়টি জানাজানি হলে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি জামায়াত আমিরের উপদেষ্টার পদসহ জামায়াতে ইসলামী থেকে তাকে লাথি মেরে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “উনার একটা ফার্মের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে শুধু চিঠি আদান-প্রদানের জন্য রাখা হয়েছিল, কিন্তু জালিয়াতির কারণে তাকে দ্রুত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”

এই সব গুরুতর ও রোমহর্ষক জালিয়াতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাহামুদুল হাসানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট ১২টি প্রশ্ন পাঠানো হলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ফোন লাইনে ৪৪ সেকেন্ড নীরব থেকে সংযোগ কেটে দেন এবং কোনো বার্তার জবাব দেননি। ছবি সংগৃহীত।

তথ্যসূত্র:কালবেলা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *