সরকারি খালে অবৈধ বাঁধের মহোৎসব

সরকারি খালে অবৈধ বাঁধের মহোৎসব

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী নিচকাটা খালে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র কর্তৃক অবৈধভাবে মাটির বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সামান্য জোয়ারের পানিতেই প্লাবিত হচ্ছে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। জোয়ারের নোনা পানি উপচে পড়ে প্রতিদিন তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ প্রধান সড়ক, ফসলি জমি ও শতাধিক বসতবাড়ি। এছাড়া তীব্র জলাবদ্ধতায় এলাকার অসংখ্য মিষ্টি পানির পুকুর ডুবে গিয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিচকাটা এলাকায় বর্তমানে একটি নতুন স্লুইসগেট (জলকপাট) নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই নির্মাণকাজের অজুহাত ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কিছু অতি লোভী ও অসাধু ব্যক্তি খালের বিভিন্ন পয়েন্টে আড়াআড়িভাবে মাটির শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করেছে। খালের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে সেখানে তারা বাণিজ্যিকভাবে মাছের ঘের তৈরি করে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে যেখানে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ার কথা, সেখানে এই কৃত্রিম বাঁধের কারণে পানি আটকে গিয়ে পুরো নিচকাটা ও সংলগ্ন গ্রামগুলোতে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জোয়ারের সময় পানি নামতে না পেরে বাড়িঘরের উঠোনে ও ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়ছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করায় নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. নাহিদ হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, “গত বছরের প্রথম দিকে চাষাবাদের সুবিধার্থে কৃষকদের অনুরোধে সাময়িকভাবে কিছু বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে যারা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থে ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সরকারি খাল দখল করে অবৈধ বাঁধ দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমি আগামীকালই (বুধবার) সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ সব অবৈধ বাঁধ কেটে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেব।”

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউছার হামিদ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান, “সরকারি খাল বা জলাশয় দখল করে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্পটে খোঁজ-খবর নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু মৌখিক নির্দেশ নয়, বরং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এই ‘খাল খেকো’দের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে এনে উপকূলীয় এই অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবন রক্ষা করতে প্রশাসনের স্থায়ী ও কঠোর নজরদারি কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

ছবি-বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *