স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলা জুড়ে একাকী নারীদের ওপর গভীর রাতে চালানো একের পর এক নৃশংস ও রোমহর্ষক হামলার নেপথ্য নায়ক, মোস্ট ওয়ান্টেড ‘সাইকো কিলার’ ও আন্তঃজেলা সিরিয়াল অপরাধী গোলাম মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) নিখুঁত বিশ্লেষণের মাধ্যমে গাজীপুরের বাসন থানা এলাকা থেকে নওগাঁ জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত গোলাম মোর্শেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের হইবর রহমান ওরফে হবিবরের ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে ৩টি জেলায় অন্তত ১৭-১৮ জন নারীর ওপর লোহার শাবল, টিউবওয়েলের হাতল ও বাঁশ দিয়ে নৃশংস হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে। যার মধ্যে ৩ জন নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
পুলিশ জানায়, মোর্শেদের অপরাধ সংঘটনের ধরন ছিল অত্যন্ত জঘন্য ও বিকৃত মানসিকতার। সে মূলত গভীর রাতে (রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে) একা থাকা বা নারীপ্রধান বাড়িগুলোকে চিহ্নিত করত। এরপর দেয়াল টপকে বা জানালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত নারীদের কপাল ও মাথায় টিউবওয়েলের হাতল, লোহার শাবল বা বাঁশ দিয়ে সজোরে আঘাত করে পালিয়ে যেত। চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য থাকলেও, ঘুমন্ত নারীদের মাথায় গুরুতর জখম করাই ছিল এই সাইকোপ্যাথের মূল লক্ষ্য ও অপরাধের সাধারণ প্যাটার্ন।
মোর্শেদের নৃশংসতার খতিয়ান:
-
১৮ জানুয়ারি ২০২৬: ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ ও জাহানপুর গ্রামে তিনটি বাড়িতে হামলা চালায় মোর্শেদ। তার মধ্যে কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার মাথায় টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে আঘাত করলে তিনি মারা যান।
-
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: একই উপজেলার জাহানপুর গ্রামে সুলতানা বেগমসহ চারজনের ওপর বাঁশ ও টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে বর্বরোচিত হামলা চালায়।
-
৭ মে ২০২৬: বদলগাছি উপজেলার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকার তিনটি বাড়িতে দেয়াল টপকে ঢুকে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) এবং বাক্প্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০)-এর মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে।
-
৪ জুন ২০২৬: পত্নীতলা উপজেলার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে দুটি বাড়িতে জানালা ভেঙে ঢুকে রোজি আক্তার (৩৭), আলতা বানু (৪৫) ও আসমা খাতুন (২২)-এর মাথায় লোহার শাবল দিয়ে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করে।
ধামইরহাট, বদলগাছি ও পত্নীতলায় একের পর এক একই ধরনের নৃশংস ঘটনার পর পুরো উত্তরবঙ্গ জুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অপরাধীকে ধরতে একটি বিশেষ টিম গঠন করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সাইবার ইউনিটের সদস্যরা ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেন। জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলা থেকে একই ধরনের অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীর মূল প্রোফাইল বা ‘ক্রাইম ডায়েরি’ শনাক্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার (১০ জুন) ভোরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার বাসন থানাধীন শরীফপুর কোনাপাড়া এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই সিরিয়াল অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর মোর্শেদকে নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কার্যালয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে ধামইরহাটের কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবা হত্যার দায় স্বীকার করে। পরবর্তীতে আজ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী নিজের জঘন্য অপরাধের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। বর্তমানে তাকে আদালতের নির্দেশক্রমে করাগারে পাঠানো হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, নওগাঁ জেলা পুলিশ অত্যন্ত নিবিড় ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সিরিয়াল অপরাধীর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। মোর্শেদ নওগাঁয় ৪টি ঘটনার পাশাপাশি দিনাজপুরে ৫টি এবং জয়পুরহাটে ১টি ঘটনা ঘটিয়েছে। দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে তার হামলায় আরও দুজন নারীর মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে নওগাঁর বিভিন্ন থানায় এ-সংক্রান্ত হত্যাসহ মোট ৪টি মামলা রুজু রয়েছে। দিনাজপুর ও জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বাকি মামলাগুলোতেও তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে পরবর্তী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ছবি সংগৃহীত।


