বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়েছে। দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পরও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় অন্তত ১ হাজার ১৯১ জন মৃত ব্যক্তির নামে নিয়মিত তোলা হচ্ছিল সরকারের বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন খাতের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউছার হামিদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষ তথ্য যাচাই-বাছাই (স্ক্রিনিং) কার্যক্রমে অবশেষে এই বিশাল ‘ভুতুড়ে’ তালিকা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রতি মাসে অসহায় ও দুস্থদের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভাতাভোগী মৃত্যুবরণ করলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের (ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার) মাধ্যমে তালিকা হালনাগাদ করে সেখানে নতুন জীবিত উপকারভোগীর নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথা। কিন্তু কলাপাড়ার একটি অসাধু চক্র, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি ও দালালদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে মৃত ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল।
সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সুত্র থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কঠোর অনুসন্ধান শুরু করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ। তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় ভোটার তালিকার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ডাটাবেজ যাচাই করতেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। একে একে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তালিকায় ১ হাজার ১৯১ জন মৃত ভাতাভোগীর নাম ভেসে ওঠে, যারা দীর্ঘদিন আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন অথচ নথিপত্রে তাঁরা ‘জীবিত’ ও নিয়মিত ভাতা তুলছেন।
এই চাঞ্চল্যকর অনিয়ম প্রসঙ্গে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, “রাষ্ট্রের ও জনগণের ট্যাক্সের টাকা প্রকৃত এবং যোগ্য উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। তালিকা শতভাগ নির্ভুল ও স্বচ্ছ করতে আমাদের বিশেষ যাচাই-বাছাইয়ে এই ১ হাজার ১৯১ জন মৃত ব্যক্তির নাম শনাক্ত হয়েছে। অনতিবিলম্বে এসব ভুতুড়ে নাম স্থায়ীভাবে ডাটাবেজ থেকে ডিলেট (বাদ) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শূন্য হওয়া এই আসনগুলোতে উপজেলার প্রকৃত অসচ্ছল ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা জালিয়াতি বরদাশত করা হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এই উপকারভোগীদের তথ্য স্বশরীরে যাচাই করার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে, প্রশাসনের এই সাহসী ও যুগোপযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন কলাপাড়ার সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজ। স্থানীয়দের মতে, ইউএনও’র এই কড়া নজরদারির কারণে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকার অপচয় ও অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদের প্রকৃত হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষগুলো তাঁদের রাষ্ট্রীয় অধিকার ফিরে পাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হলো। নেপথ্যে থাকা চক্রটিকেও চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

