স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দেশজুড়ে পাইকারি ও খুচরা (গ্রাহক) উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য পুনর্বিন্যাস ও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক ঘোষিত নতুন এই মূল্যহার অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সাধারণ গ্রাহক তথা খুচরা পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক cider শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিইআরসির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং কিছু গ্রাহক শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মাসিক বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত পাইকারি বিদ্যুতের দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পূর্বে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৭ টাকা বা ৭ দশমিক ০৪ টাকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে ৮ টাকা ৩৯ টাকায় উন্নীত হয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের এই বড় ধরনের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় ব্যাপক হারে বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পরবর্তীতে গ্রাহক পর্যায়ের বিদ্যুৎ বিলে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত খুচরা বিদ্যুতের দামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পূর্বে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পুরনো দাম ছিল ৯ টাকা ১১ পয়সা। কমিশনের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের বর্তমান নতুন দাম নির্ধারিত হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। শুধু বিদ্যুতের মূল দামই নয়, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন চার্জ ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি। বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার মোট ব্যয় আরও বাড়বে, যার বড় প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দাবি, উৎপাদন ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের ভিত্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ দশমিক ৯১ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যয়, তীব্র ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ মোকাবিলার অংশ হিসেবে এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। যদিও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন খরচ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে কমিশন বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই চূড়ান্ত মূল্যহার নির্ধারণ করেছে।
এটি বিদ্যুতের দামে সাম্প্রতিক সময়ের প্রথম বৃদ্ধি নয়; এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল। একাধিক ধাপে এভাবে মূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কারণ বিদ্যুৎ শুধু গৃহস্থালি খরচ নয়, বরং শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি এবং সেবা খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সামগ্রিক বাজারমূল্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার ঘোষণার পর সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে বাড়তি খরচের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাজারে আরও বাড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে এই মূল্য বৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও, এর ফলে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এখন সবার নজর থাকবে এই মূল্য সমন্বয় বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা ও সেবার মান উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে তার ওপর।
ছবি সংগৃহীত।


