স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
রাজধানীর পল্লবীতে স্থানীয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার (৭) হত্যাকাণ্ডের গা শিউরে ওঠা ও পৈশাচিক কারণ উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, প্রতিবেশী যুবকের বিকৃত যৌনলালসা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অবুঝ শিশুটি। পরে রক্তক্ষরণ ও বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে আলামত গোপন ও মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জরুরি ও হাই-ভোল্টেজ সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম এসব রোমহর্ষক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নৃশংস এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত ও তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
র্যাব ও ডিএমপির যৌথ তথ্যপ্রযুক্তি অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মূল ঘাতক মো. জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩০) ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না। পেশায় রিকশা মেকানিক জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও নাটোর জেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি কড়া মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলের আলামত ও সুরতহাল দেখে আমাদের নিরেট ধারণা, শিশুটির সঙ্গে কোনো বিকৃত যৌন আচরণ বা জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শিশুটির কান্না দেখে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ টের পেয়ে যাওয়ার ভয়েই শিশুটিকে প্রথমে শ্বাসরোধে মেরে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে ডেড বডিটা খণ্ড খণ্ড করে বস্তাবন্দি করে গুম করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়।” তবে ধর্ষণের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠিয়ে কেমিক্যাল ও ডিএনএ ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ আরও জানায়, মূল ঘাতক জাকিরের স্ত্রী স্বপ্নার জবানবন্দি অনুযায়ী, জাকির হোসেন চরম বিকৃত যৌনরুচি সম্পন্ন একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক এবং সে এই বিকৃত লালসার কারণে তাঁর স্ত্রীকেও বিভিন্ন সময় পাশবিক নির্যাতন করত।
তদন্তে জানা গেছে, নিহত রামিসার পরিবার ওই বহুতল ভবনে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে বসবাস করলেও অভিযুক্ত খুনি দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা যখন খুঁজতে বের হন, তখন ওই ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার ছোট স্যান্ডেল জোড়া দেখতে পান।
পুলিশ জানায়, রামিসার মা যখন দরজায় অনবরত নক করছিলেন ও ডাকাডাকি করছিলেন, ঠিক তখনই ভেতর ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটাচ্ছিল ঘাতক জাকির। মূল আসামি জাকির যেন ঘরের পেছনের জানালা দিয়ে পালাতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই বাইরে রামিসার মাকে দাঁড় করিয়ে রেখে স্ত্রী স্বপ্না দীর্ঘক্ষণ দরজা খোলেননি। জাকির জানালার লোহার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল স্বপ্না দরজা খোলেন। সে নিজে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে স্ত্রী স্বপ্নাকে অবরুদ্ধ করে আটক করে। তবে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় প্রধান খুনি জাকির। পরে ডিএমপির ডিবি সাইবার ক্রাইম উইংয়ের প্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, জাকির ছদ্মবেশে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে একটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানে তার বন্ধুর মাধ্যমে পাঠানো টাকা তুলতে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ ও দোকানদারের সহায়তায় ডিএমপির একটি বিশেষ টিম সেখানে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বিকাশের দোকান থেকেই টাকা তোলার মুহূর্তে ঘাতক জাকিরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
এর আগে আজ মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত দেহ এবং পরে বাথরুমের বালতি থেকে খণ্ডিত মাথা ও হাত উদ্ধার করে পুলিশ। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় পুরো রাজধানী জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি চাঞ্চল্যকর ও নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

