আপন মামিকে জবাই করে লাশের পাশে ধারালো অস্ত্র হাতে বসেছিলেন ভাগনে রিপন

আপন মামিকে জবাই করে লাশের পাশে ধারালো অস্ত্র হাতে বসেছিলেন ভাগনে রিপন

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় পারিবারিক সম্পর্ক ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটিয়ে এক লোমহর্ষক, নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আপন ভাগনের উপর্যুপরি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সাথী আক্তার (২৮) নামের এক গৃহবধূ ঘরের মেঝেতেই গলায় কেটে পৈশাচিক খুনের শিকার হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে না গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় রক্তমাখা মরদেহের পাশেই একই কক্ষে ধারালো অস্ত্র হাতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করছিলেন ১৯ বছর বয়সী ঘাতক ভাগনে। গত রবিবার (২৪ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায় এই হাড়হিম করা ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একটি যৌথ চৌকস দল  অভিযুক্ত ঘাতক ভাগনে রিপন মিয়াকে (১৯) রক্তমাখা অস্ত্রসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মানিকগঞ্জ জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, চাঞ্চল্য ও নিন্দার ঝড় বইছে।

পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আভিযানিক নথির সুনির্দিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া নিহত সাথী আক্তার কাটিগ্রাম এলাকার কাতার প্রবাসী শুকুর আলীর সহধর্মিণী। অন্যদিকে, হাতেনাতে গ্রেপ্তারকৃত পাষণ্ড ঘাতক রিপন মিয়া একই এলাকার আতাউর রহমান আতার পুত্র এবং নিহত সাথী আক্তারের আপন ভাগনে।

পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী শুকুর আলীর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী সাথী আক্তার বাড়িতে একা থাকতেন এবং তাঁর দেখভাল ও বিভিন্ন পারিবারিক প্রয়োজনে ভাগনে রিপন মিয়া প্রায়ই ওই বাড়িতে যাতায়াত করতেন। গত রবিবার রাতে কোনো একটি অজ্ঞাত পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়ে ঘরের ভেতর মামি সাথী আক্তারের সাথে ভাগনে রিপন মিয়ার তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে রিপন মিয়া চরম ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ঘর থেকে ধারালো ছড়া বা চাপাতি বের করে মামি সাথী আক্তারের ওপর চড়াও হন এবং তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপানোর পাশাপাশি গলায় সজোরে আঘাত করেন। ধারালো অস্ত্রের গভীর ও নৃশংস আঘাতে শ্বাসনালী কেটে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ঘটনাস্থলেই ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অসহায় এই গৃহবধূ।

এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা এক চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় তথ্য সামনে এনেছে স্থানীয় যুবসমাজ। জানা গেছে, মামিকে গলার নলি কেটে হত্যা করার ঠিক কয়েক মিনিট আগে ঘাতক রিপন মিয়া তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডির স্টোরিতে একটি চূড়ান্ত বিদায়ের বার্তা পোস্ট করেন। সেখানে সে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে লেখে—”জীবনের লাস্ট স্টোরি, আমাকে সবাই মাফ করে দিয়েন।” এই পোস্টটি দেখে তার বন্ধুরা যখন তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে, ততক্ষণে সে নিজের মামিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বাড়ি ও ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলে প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরবর্তীতে জানালা দিয়ে কলোনীবাসী ও প্রতিবেশীরা দেখতে পান যে, ঘরের মেঝেতে সাথী আক্তারের রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে রয়েছে এবং পাশে রক্তমাখা ছোঁড়া হাতে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে বসে আছেন রিপন। এই দৃশ্য দেখে এলাকায় তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিস ও মডেল থানাকে অবহিত করা হয়।

খবর পাওয়ার সাথে সাথেই মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জের বিশেষ নির্দেশনায় পুলিশের একটি সশস্ত্র দল ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা দ্রুত কাটিগ্রামের ওই বাড়িটি চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে খুনি রিপন মিয়াকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে তার হাতের ধারালো অস্ত্রটি জব্দ করে এবং তাকে লোহার খাঁচায় পোরা হয়। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় নিহত গৃহবধূর ছিন্নভিন্ন মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন ঘটনার আইনগত অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “পারিবারিক আক্রোশের জেরে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। খবর পাওয়ামাত্রই আমাদের টিম দ্রুত অ্যাকশন নিয়ে খুনের সাথে সরাসরি জড়িত প্রধান ও একমাত্র আসামি রিপনকে রক্তাক্ত আলামতসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। তুচ্ছ কথা কাটাকাটি নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য বা আর্থিক লেনদেনের বিরোধ রয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে ডিবি ও থানা পুলিশ।” পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, আজ দুপুরের পর সমস্ত আইনি ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক রিপন মিয়াকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বিজ্ঞ বিচারক তার জামিন আবেদন কঠোরভাবে নামঞ্জুর করে সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে চলমান রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *