পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সোনাতলা নদী পারাপারের অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ তেগাছিয়া খেয়াঘাটে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য ও প্রকাশ্য জুলুমের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। কলাপাড়া উপজেলার সমস্ত খেয়াঘাটে সরকারি নিয়ম মেনে জনপ্রতি ৫ টাকা করে ভাড়া আদায়ের নিয়ম থাকলেও, এই তেগাছিয়া ঘাটে বছরের পর বছর ধরে জোরপূর্বক দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ টাকা করে আদায় করছে এক প্রভাবশালী ইজারাদার চক্র। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব যেমন ঈদ-কোরবানি কিংবা সন্ধ্যার পরে এই ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়িয়ে যায় ২০ টাকা পর্যন্ত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে এই খেয়াঘাটের ভাড়া আদায়কারীরা সাধারণ নিরীহ মানুষের পকেট কেটে অন্তত প্রায় অর্ধ কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা জুলুমবাজ ও চাঁদাবাজ চক্রের এই অবৈধ সিস্টেমকে বর্তমানে সরকারি রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সমভাবে সচল রেখেছেন, যার ফলে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি মাঠপর্যায়ে চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও খেয়াচালকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, সোনাতলা নদী পারাপার হয়ে প্রতিদিন এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে গড়ে অন্তত চারশত মানুষ যাতায়াত করেন। সেই হিসাবে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ৫ টাকা করে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়ে দৈনিক অন্তত ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত পকেটে ভরছে চাঁদাবাজ চক্রটি। এই হিসাবে মাসে ৬০ হাজার এবং বছরে কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা অবৈধভাবে লুটে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে এক এক করে দীর্ঘ ছয়টি বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এই প্রকাশ্য লুণ্ঠন। ঘাট পরিচালনাকারী গোলবুনিয়া গ্রামের প্রভাবশালী গাজীবাড়ির একটি চক্রের হাতে সাধারণ যাত্রীরা এতটাই অসহায় যে, এই জুলুম ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বললেই সাধারণ মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এমনকি গেল বছর এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় এক সম্মানিত শিক্ষককে এই ঘাটে নির্মমভাবে মারধর পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে সাধারণ মানুষ মান-ইজ্জত ও শারীরিক নির্যাতনের ভয়ে চরম ক্ষোভ ও অনুযোগ মনে চেপে মুখ বুজে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এবারের কোরবানির ঈদেও খেয়ার মাঝি ও টাকা আদায়কারী রাকিবুল গাজী যাত্রীদের সাথে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আগে থেকেই ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, এখনও ১০ টাকাই নেওয়া হবে, এর বাইরে কোনো কথা চলবে না। এছাড়া ঘাটের পরিচালনাকারীরা খেয়াঘাটে বসে প্রকাশ্য লুডু খেলায় মত্ত থাকে, তাদের খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের নদীর তীরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় এবং রাত আটটার পর যাত্রীদের একা পেয়ে ইচ্ছামতো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
স্থানীয় যাত্রী আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সোনাতলা নদীতে ফুলবুনিয়া, রাজ্জাক সিকদার বাড়ির খেয়াঘাট, বাইনতলা ও আরামগঞ্জ খেয়াঘাটসহ মোট চারটি খেয়া চালু রয়েছে এবং কলাপাড়া উপজেলার সমস্ত খেয়াঘাটেই সরকারি রেট অনুযায়ী ৫ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও নিয়মবহির্ভূত চিত্র কেবল এই তেগাছিয়া খেয়াঘাটে। কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তেগাছিয়ার এই বিতর্কিত খেয়াটি এবার দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা নিয়েছেন মো. হারেচ গাজীর ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন। কলাপাড়া উপজেলায় এই বছর মোট ২০টি খেয়াঘাট ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং সবগুলো ঘাটেরই সরকারি রেট ৫ টাকা নির্ধারণ করা রয়েছে। এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাউছার হামিদ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, তেগাছিয়া খেয়াঘাটের এই অনিয়মের বিষয়টি তিনি অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখবেন এবং সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষার্থে খুব দ্রুতই প্রত্যেকটি খেয়াঘাটে সরকারি রেটচার্ট বা ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানানোর কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ছবি প্রতিবেদক।

