শত্রুতার বলি অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র সম্বল পান বরজ!

শত্রুতার বলি অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র সম্বল পান বরজ!

মো. মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় ব্যক্তিগত পূর্ব শত্রুতার জেরে এক অসহায় ও নিঃস্ব বৃদ্ধ দম্পতির বেঁচে থাকার একমাত্র জীবিকার উৎস ১০ কাঠার একটি ফলন্ত পান বরজ রাতের আঁধারে কেটে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা। বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) ভোররাতে উপজেলার জামাল ইউনিয়নের দুধরাজপুর গ্রামে এই বর্বরোচিত নাশকতার ঘটনাটি ঘটে। এই পৈশাচিক ঘটনায় আয়ের সব পথ হারিয়ে চরমভাবে ভেঙে পড়েছেন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ কাজী আলেক ও তাঁর স্ট্রোকাক্রান্ত অসুস্থ স্ত্রী। ক্ষতিগ্রস্ত এই দম্পতির বুকফাটা আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে প্রতিদিনের খাবারের খরচ এবং অসুস্থ স্ত্রীর নিয়মিত দামি ওষুধের ব্যয়ভার মেটানোর একমাত্র ভরসা ছিল এই ১০ কাঠার পান বরজটি। প্রতিদিনের মতো বুধবার ভোরে ফজরের নামাজ শেষ করে কাজী আলেক তাঁর পরম যত্নে গড়ে তোলা পান বরজে গিয়ে থমকে যান। তিনি দেখতে পান, প্রতিটি পানগাছের গোড়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে কেটে পুরো বরজটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গভীর রাতের কোনো এক প্রহরে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে দুর্বৃত্তরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে বৃদ্ধ কাজী আলেক বলেন, “এই বরজের যৎসামান্য আয়েই আমাদের সারা বছরের ডাল-ভাতের সংসার চলত। আমার অর্ধাঙ্গিনী দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী, তাঁর ওষুধের টাকাও আমি এখান থেকেই জোগাড় করতাম। এখন আমরা বুড়ো-বুড়ি কীভাবে বাঁচব, কোথায় দাঁড়াব— তা ভাবতেই বুক ফেটে যাচ্ছে।”

চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তাঁর অসুস্থ স্ত্রীও। বরজের কাটা ও শুকিয়ে যাওয়া পানগাছের পাশে বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমাদের এই বরজ ছাড়া আর কোনো মাথা গোঁজার বা বেঁচে থাকার সম্বল ছিল না। যারা আমাদের এই শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিল, আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।”

কাজী আলেক জানান, সামান্য বসতভিটা ও এই পান বরজ ছাড়া তাঁর আর কোনো আবাদি বা কৃষিজমি নেই। তাঁদের একমাত্র সন্তান অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে নিজের সংসার চালান। ফলে এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির পর পুরো পরিবারটি এখন এক গভীর ও চরম অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছে। তিনি প্রশাসনের কাছে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে, অসহায় ও নিঃসহায় এক বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র আয়ের চাক্ষুষ উৎসটি এভাবে কেটে নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার সচেতন মানুষ ও প্রতিবেশীরা অনতিবিলম্বে এই অমানবিক অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতির চিত্র দেখেছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *