স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
আজ সোমবার (৮ জুন ২০২৬) ফিলিপাইন ও তার আশপাশের অঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি অতি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের রেশ কাটতে না কাটতেই আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমিকম্প ঝুঁকি। বিশেষ করে গত রবিবার (৭ জুন) রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে বাংলাদেশে অনুভূত হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূকম্পন দেশের মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক ও টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত যেখানে যেকোনো সময় ৮ মাত্রার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষা ‘ডাউকি ফল্ট’ (প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূ-ফাটল রেখা) সহ সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের ভূগর্ভে দীর্ঘকাল ধরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে। দীর্ঘ সময় বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় এই শক্তি যেকোনো মুহূর্তে মুক্তি পেতে পারে, যা দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদের সংকেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অবজারভেটরির সাবেক পরিচালক ও প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, সিলেট-কক্সবাজার বেল্টের নিচে জমে থাকা শক্তির কারণে ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে তার ফল হবে প্রলয়ংকরী।
বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন সময়ের গবেষণা ও জরিপে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ:
-
ভবন ধসের আশঙ্কা: ২০০৯ সালে জাইকা (JICA) ও সিডিএমপি (CDMP)-র যৌথ জরিপে সতর্ক করা হয়েছিল যে, রাজধানী ঢাকায় ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলেই প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং ১ লাখের বেশি ভবন আংশিক বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
-
বিপুল প্রাণহানি: অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ভূমিকম্পের তীব্রতায় ঢাকার মাত্র ১ শতাংশ ভবনও যদি ধসে পড়ে, তবে ধসে যাওয়া ভবনের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৬ হাজার। আর এই ১ শতাংশ ভবন ধসের কারণেই অন্তত ৩ লাখ মানুষ সরাসরি হতাহত বা আটকা পড়তে পারেন।
-
ভূমিকম্প সহনশীলতার অভাব: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল বা ‘আর্থকোয়েক রেজিস্ট্যান্ট’ আইন মেনে তৈরি। বাকি ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ ভবনই চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
ঝুঁকি বাড়ার মূল কারণ এবং করণীয়: নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা) না মানা, অতি ঘনবসতি এবং মাটির গুণাগুণ বিচার না করে দুর্বল নির্মাণ কাঠামো তৈরি করায় আমাদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এই সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন:
১. ভবন রেট্রোফিটিং: ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শক্তিশালী বা ‘রেট্রোফিটিং’ করতে হবে, যাতে অন্তত তা হুড়মুড় করে ভেঙে না পড়ে।
২. জরুরি প্রস্তুতি ও মহড়া: স্মার্ট সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করা, স্কুল-কলেজে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত উদ্ধার মহড়া ও স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি আমাদের দোরগোড়ায়। এখন আর সময় নষ্ট না করে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র কার্যকর উপায়।
ফিলিপাইনে ভূমিকম্পের দৃশ্য, ছবি ভিডিও থেকে সংগৃহীত।

