কুয়াকাটায় রাখাইনদের জলকেলি উৎসব

কুয়াকাটায় রাখাইনদের জলকেলি উৎসব

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু,কলাপাড়া :

পুরাতন বছরের গ্লানি ও দুঃখ ভুলে নতুন আশার আলোয় জীবনকে রাঙাতে কুয়াকাটায় শুরু হয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী মাহা সাংগ্রাই জলকেলি উৎসব। তিন দিনব্যাপী এ উৎসবে মেতে উঠেছে রাখাইন তরুণ-তরুণীরা, পাশাপাশি দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে কুয়াকাটার শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন রাখাইন মহিলা মার্কেটে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহব্বত খান, ট্যুরিস্ট পুলিশ পরিদর্শক জয়ন্ত, এসআই সজল সাহা এবং কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক জসিম পারভেজ, কলাপাড়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন বিপু,কলাপাড়া প্রেসক্লাব সদস্য ফরাজী মো, এমরান সহ  স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

উৎসবকে ঘিরে রাখাইনপাড়ায় বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। সকাল থেকেই জলকেলিতে অংশ নিতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিড় জমায় মানুষ। এমনকি পার্শ্ববর্তী বরগুনা জেলা থেকেও রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষজন অংশ নিতে আসেন।

উৎসবস্থলে নানা প্রজাতির ফুল আর রঙ-বেরঙের কাগজে সাজানো প্যান্ডেলে পানি ভর্তি নৌকা।ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে রাখাইন তরুণীদের অপেক্ষা। আর নানা সাজে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নেচে-গেয়ে দলবেঁধে এক-একটি প্যান্ডেলে ছুটে যাচ্ছেন নানা বয়সের মানুষ সহ তরুণের দল। প্যান্ডেলে পৌঁছেই এক-একজন তরুণ তাদের পছন্দের তরুণীদের নিক্ষেপ করে পানি। আর তরুণীও পানি নিক্ষেপ করে প্রতিউত্তর দেয়। এরপর টানা চলে একে অপরকে পানি নিক্ষেপের এই খেলা। নাচ-গান আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কিশোর-কিশোরীরা দলবেঁধে জলকেলিতে মেতে উঠে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।

রাখাইন তরুণী মিয়াশু বলেন, সাংগ্রাই আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। আমরা বিশ্বাস করি, পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট এই পানির সঙ্গে মুছে যায়। নতুন বছরে আমরা নতুনভাবে শুরু করি।

আরেক তরুণ উখিন বলেন, এই জলকেলির মাধ্যমে আমরা একে অপরের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগাভাগি করি। এটি শুধু আনন্দের নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।

দর্শনার্থী রাকিব হোসেন বলেন, এটা আমার জীবনে প্রথমবার এমন উৎসব দেখা। খুবই উপভোগ করছি। সবাই একসাথে আনন্দ করছে এটা সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।

ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী তামান্না মুমু বলেন, রাখাইনদের এই উৎসব খুবই ব্যতিক্রম। পানি ছিটিয়ে আনন্দ করার এই আয়োজন আমাদের মুগ্ধ করেছে।

রাখাইন পঞ্জিকা অনুসারে ১৩৮৭ রাখাইন বর্ষ শেষ হয়েছে বুধবার ১৫ এপ্রিল। বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ১৩৮৮ রাখাইন বর্ষ। আর এই বর্ষ বিদায় ও বরণে  রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ৩ দিনের জলকেলি উৎসব শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে রাখাইন বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসব পালন করে হচ্ছে দীর্ঘদিনের। সামাজিক নিয়ম মতে, ৭ দিনের মাহা সাংগ্রাই শুরু হয় ১২ এপ্রিল। আর তিন দিনের জলকেলি উৎসবের মধ্যে দিয়ে ১৮ এপ্রিল এই উৎসবের শেষ হবে। প্রতিদিনই থাকবে জলকেলির পাশাপাশি মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাখাইন পরিবারগুলোতে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন পিঠাপুলি, যা এ উৎসবের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ কাউছার হামিদ বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের এই সাংগ্রাই উৎসব আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই জলকেলি উৎসব শুধু রাখাইন সম্প্রদায়ের নয়, এখন এটি কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ছবি প্রতিবেদক।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *