এক লাখ টাকার ‘শর্ত’ যখন নিজের বোন! আল-আমিনকে নৃশংস খুনের আদ্যোপান্ত

এক লাখ টাকার ‘শর্ত’ যখন নিজের বোন! আল-আমিনকে নৃশংস খুনের আদ্যোপান্ত

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :

টাকা ধারের বিনিময়ে বন্ধুত্বের পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্কিত করে বন্ধুর নিজের বোনকেই ‘ভোগ’ করার কুপ্রস্তাব। আর সেই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতেই সাজানো হলো নিখুঁত এক ডেডলি ট্র্যাপ (মৃত্যুফাঁদ)। মোবাইল ফোনে মগ্ন থাকা বন্ধুর গলায় পেছন থেকে হঠাৎ পেঁচিয়ে ধরা হলো রশি, আর চোখের পলকে ধারালো চাকুর এক পোঁচে শরীর থেকে আলাদা করে দেওয়া হলো মাথা!

শেরপুরের চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের নতুন বাগলগড় গ্রামের এক নির্জন ঘাসক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সেই চাঞ্চল্যকর মাথাবিচ্ছিন্ন গলিত লাশের ক্লুলেস রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উন্মোচন করেছে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)। গ্রেফতার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড শুভ ও তার ভাড়াটে সহযোগী সম্রাটকে।

তদন্তের গভীরে গিয়ে পিবিআই জানতে পেরেছে, নিহত আল-আমিনের এক ডিভোর্সি বোনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল ঘাতক শুভর। দুই বন্ধুর এই গভীর প্রেম নিয়ে দুই পরিবারেই চলছিল চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আল-আমিন বারবার শুভকে তাঁর বোনের জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

এরই মধ্যে, শুভ নিজের একটি মোটরবাইকের গ্যারেজ খোলার জন্য আল-আমিনের কাছে এক লাখ টাকা ধার চায়। আর এখানেই ঘটে মূল ট্র্যাজেডি। আল-আমিন টাকা দেওয়ার শর্ত হিসেবে সরাসরি শুভর নিজের আপন বোনের সাথে অনৈতিক ও আপত্তিকর সম্পর্ক গড়ার ইঙ্গিত দেয়। বন্ধুর মুখে নিজের বোনের প্রতি এমন কুৎসিত প্রস্তাব শুভকে ক্ষ্যাপা নেকড়েতে পরিণত করে। তখনই আল-আমিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষে সে।

প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা শুভ একা ঝুঁকি নিতে চায়নি। সে তাঁর চেনা সহযোগী সম্রাটকে মাত্র ১০ হাজার টাকার লোভ দেখিয়ে এই কিলিং মিশনে পার্টনার বানায়। গত ১৩ মে দুপুরের তপ্ত রোদে আল-আমিনকে কৌশলে একটি মোটরসাইকেলে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নতুন বাগলগড় গ্রামের এক সুনসান ঘাসক্ষেতের ভেতর।

ঘাসক্ষেতের আড়ালে দাঁড়িয়ে আল-আমিন যখন আপনমনে তাঁর মোবাইলের স্ক্রিনে মগ্ন ছিলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে তাঁর গলায় ফাঁসের মতো রশি পেঁচিয়ে ধরে শুভ। আল-আমিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সম্রাট তাঁর হাত-পা লক করে মাটিতে চেপে ধরে। এরপর পকেট থেকে ধারালো চাকু বের করে আল-আমিনের গলায় চালিয়ে দেয় শুভ। শরীর থেকে মাথা আলাদা করে রক্তক্ষরণের মাঝেই লাশটি ঘাসের স্তূপে লুকিয়ে তারা চম্পট দেয়।

হত্যাকাণ্ডের ৫ দিন পর গত ১৮ মে ওই ক্ষেত থেকে আল-আমিনের মাথা বিচ্ছিন্ন, পোকা ধরা ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশের পরনের ট্রাউজার আর জুতো দেখে চোখের জলে ছেলেকে শনাক্ত করেন হতভাগ্য পিতা সাইফুল ইসলাম।

মামলাটি পিবিআই-এর হাতে যাওয়ার পরপরই শুরু হয় হাই-টেক গোয়েন্দা নজরদারি। পিবিআই জামালপুরের পুলিশ এসপি পঙ্কজ দত্তের নিখুঁত নির্দেশনায় মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে শেরপুরের বাগলগড় গুচ্ছগ্রাম থেকে প্রথমে বাগে আনা হয় মূল ঘাতক শুভকে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যে জামালপুর থেকে গ্রেফতার হয় সহযোগী সম্রাট। জব্দ করা হয় কিলিং মিশনে ব্যবহৃত সেই রশি ও মোটরসাইকেল।

বুধবার (২০ মে) বিকেলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআই জানায়, আদালতে প্রধান আসামি শুভ নিজের মুখে খুনের লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। একটি কুপ্রস্তাব আর এক লাখ টাকার ধারের ইগো কীভাবে দুই বন্ধুকে খুনি আর লাশে পরিণত করলো, তা এখন পুরো শেরপুর ও জামালপুরে টক অব দ্য কান্ট্রি। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *