ইতালি পাঠানোর নামে লিবিয়ায় বিক্রি : ৬৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

ইতালি পাঠানোর নামে লিবিয়ায় বিক্রি : ৬৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ার টর্চার সেলে জিম্মি করে এক বাংলাদেশীকে অমানবিক নির্যাতন এবং তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের এক লোমহর্ষক ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে ভিকটিম সোহেলকে হারাতে হয়েছে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর সাঁড়াশি অভিযান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দূতাবাসের সমন্বয় এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো কঠোর পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত লিবিয়া থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে সোহেলকে। এই ঘটনায় পাচার চক্রের ৩ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আদালতে ভিকটিমসহ দুই পক্ষই জবানবন্দি দিয়েছে।

ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিকটিম সোহেলের প্রতিবেশী রিয়াজুল নামের এক ব্যক্তি ইতালিতে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার নাম করে ২৩ লাখ টাকার চুক্তি করেন। কিন্তু টাকা নিয়ে সোহেলকে ইতালির পরিবর্তে লিবিয়ার ত্রিপলী শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে অবস্থানরত একটি আন্তর্জাতিক অপহরণকারী ও মানব পাচারকারী চক্রের নিকট তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। লিবিয়ার সেই টর্চার সেলে সোহেলকে জিম্মি করে দিনের পর দিন অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং সেই নির্যাতনের অডিও-ভিডিও পাঠিয়ে বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের কাছে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নিরুপায় হয়ে ভিকটিমের পরিবার বিভিন্ন অজুহাতে ধাপে ধাপে প্রায় ৬৩ লক্ষ টাকা অপহরণকারীদের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে কোনো উপায় না দেখে ভিকটিম সোহেলের স্ত্রী উর্মি বেগম বাদী হয়ে প্রতারক রিয়াজুলসহ ১১ জন এজাহারনামীয় এবং আরও ৫-৬ জন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে রাজধানীর তুরাগ থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরই পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্ব-উদ্যোগে তদন্তের ভার গ্রহণ করে।

পিবিআই-এর বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে গত ২১ এপ্রিল মামলার এজাহারনামীয় আসামী টিটু মীর ও রহিমা বেগমকে গ্রেফতার করে। তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের ডিলিট হওয়া বার্তা, ভয়েস কল এবং লেনদেনের তথ্য প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয় যে, বিদেশে অবস্থানরত রিয়াজুলের সরাসরি নির্দেশনায় বাংলাদেশে আলাউদ্দিন ও হিমেল নামের দুই ব্যক্তি এই অর্থ সংগ্রহের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন। এই আর্থিক গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানা এলাকা হতে চক্রের আরেক অন্যতম হোতা ইসমাইল দেওয়ানকে আটক করে পিবিআই।

তদন্তকারী সংস্থাটির অনুরোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এই মানব পাচার চক্রের ব্যবহৃত একাধিক সন্দেহভাজন ব্যাংক হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করে দেয়। পিবিআই’র এই ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযানের ফলে চক্রের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। বেগতিক দেখে লিবিয়ায় অবস্থানরত অপহরণকারীরা ভিকটিম সোহেলকে ত্রিপলীর একটি অজ্ঞাত জনমানবহীন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহায়তায় তিনি প্রথমে নিরাপদ আশ্রয় নেন। এরপর পিবিআই, জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনওডিসি (UNODC), লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম (IOM)-এর যৌথ ও সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সোহেলকে নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে আইওএম-এর আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

অবশেষে গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে ভিকটিম সোহেলকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আইওএম-এর সহায়তায় পিবিআই নিজেদের হেফাজতে গ্রহণ করে দেশে ফিরিয়ে আনে। দেশে ফেরার পর ভিকটিম সোহেল এবং গ্রেফতারকৃত আসামী রহিমা বেগম—উভয়েই বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার ও ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। আন্তর্জাতিক এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতার এবং অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নেওয়া অর্থপাচারের (মানি লন্ডারিং) পুরো নেটওয়ার্ক উদঘাটনে পিবিআই-এর তদন্ত ও অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলমান রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *