১৪১ শিক্ষকই ‘ভুয়া’! : দেশজুড়ে দেড় হাজার জাল শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে ৩৭৫ কোটি টাকা

১৪১ শিক্ষকই ‘ভুয়া’! : দেশজুড়ে দেড় হাজার জাল শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে ৩৭৫ কোটি টাকা

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

দেশের শিক্ষা খাতে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি, ভয়াবহ দুর্নীতি ও অভিনব জাল সনদের সিন্ডিকেট উন্মোচন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— রাজধানীর বেইলি রোডের ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোট ১৪১ জন শিক্ষকের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া!

নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষকেরা কেউ অনার্স পাশের জাল সনদ, কেউ ভয়ার্ত ভুয়া নিয়োগ বোর্ড, আবার কেউ এনটিআরসিএ (NTRC) ও ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ ব্যবহার করে বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে চাকরি করে আসছিলেন। প্রতিষ্ঠান দুটির এই বিস্ফোরক তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

ডিআইএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মোট ১৩৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৮ জনেরই নিয়োগ জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে। শুধু শিক্ষক নিয়োগেই নয়, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির তহবিল থেকে ইচ্ছেমতো কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা অবৈধভাবে বেসরকারি বেতন বাবদ ৯৭ লাখ টাকা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা পকেটে পুরেছেন। এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে আরও ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ গায়েব, বিধি বহির্ভূতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ লিজিং কোম্পানিতে প্রায় ৮ কোটি টাকার এফডিআর করা এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার নামে দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও চরম লুটপাট হয়েছে।

জালিয়াতির দিক থেকে সিদ্ধেশ্বরীকেও হার মানিয়েছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানের ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনেরই নিয়োগ অবৈধ! বিস্ময়কর তথ্য হলো, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের নিজের সব সনদই জাল। তিনি স্কুলে নিজের পদ বাণিজ্য ও আত্মীয়করণের এক পারিবারিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক তাঁর নিজের স্ত্রী (অফিস সহায়ক), ছেলে (ল্যাব সহকারী), ছেলের বউ (ল্যাব সহকারী), মেয়ে (ল্যাব সহকারী), বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রী, চাচাতো ভাইবোন এবং এমনকি নিজের ব্যক্তিগত গাড়িচালককেও জাল সনদে শিক্ষক ও কর্মচারী বানিয়ে দিয়েছিলেন। নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতি মাসে তাদের বেতন-ভাতার একটি অংশও নিজে কেটে রাখতেন অধ্যক্ষ। এই ভুয়া সিন্ডিকেটের পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে অপচয় হওয়া ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ফেরত আনার পাশাপাশি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার জোর সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম জানান, শুধু এই দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশব্যাপী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষকের জাল সনদ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের সবাইকে ইতোমধ্যে শোকজ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই জাল সনদধারীরা এ পর্যন্ত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৩৭৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেছেন, যা কঠোরভাবে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই লজ্জাজনক কেলেঙ্কারির বিষয়ে দেশের শীর্ষ শিক্ষাবিদেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, চাকরিতে যোগদানের সময় যথাযথভাবে সনদ যাচাই না করার এবং শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরের বড় সিন্ডিকেটের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। শুধু শিক্ষকদের শাস্তি দিলেই হবে না, এই জালিয়াতি ও ভুয়া নিয়োগের সাথে শিক্ষা বোর্ডের যে সমস্ত কর্মকর্তা ও গভর্নিং বডির সদস্যরা জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রতীকী-ছবি ফাইল ।

সূত্র-ইত্তেফাক।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *