নারী পুলিশ রোজিনার জালিয়াতির খতিয়ান : আইনের রক্ষকই যখন আইনের চোখে পলাতক!

নারী পুলিশ রোজিনার জালিয়াতির খতিয়ান : আইনের রক্ষকই যখন আইনের চোখে পলাতক!

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :

আদালতের চোখে তিনি ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি। কিন্তু বাস্তবে তিনি বহাল তবিয়তে পোশাক পরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন! ১০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতি ও অন্য একটি জালিয়াতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও নিয়মিত সরকারি চাকরি করে যাচ্ছেন রোজিনা আক্তার (২৯) নামের এক নারী পুলিশ সদস্য। সাধারণ কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হলে যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ দরজায় কড়া নাড়ে, সেখানে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কীভাবে পুলিশ লাইনে ডিউটি করছেন, তা নিয়ে জামালপুর ও শেরপুরের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযুক্ত রোজিনা আক্তার নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া পূর্বধলা থানার সরাপাড়া গ্রামের মো. আবু তাহেরের মেয়ে। এক সময় শেরপুর সদর পুলিশ লাইনসে কর্মরত থাকা রোজিনা বর্তমানে জামালপুর জেলা পুলিশ লাইনসে কর্মরত আছেন। শেরপুরে ডিউটি করার সময় তিনি শহরের চকপাঠস্থ নয়ানী সমাজ মহল্লায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোজিনা আক্তারের জালিয়াতির খতিয়ান বেশ লম্বা। এই চেক জালিয়াতি মামলার আগেই শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার রেখা পারভিন নামের এক নারীর দায়ের করা প্রতারণা মামলায় শ্রীবরদী সিআর আদালত সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে রোজিনাকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু সেই সাজা পরোয়ানা গোপন রেখেই তিনি নতুন করে অর্থ আত্মসাতের ফাঁদ পাতেন।

আদালতের নথি (সিআর মোকদ্দমা নং-৫৫৫/২০২৫) অনুযায়ী, শেরপুর সদর উপজেলার চকপাঠক এলাকার বাসিন্দা মো. রমজান আলীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ পারিবারিক সংকটের কথা বলে নগদ ১০ লাখ টাকা ধার নেন রোজিনা। গ্যারান্টি হিসেবে তিনি প্রাইম ব্যাংক শেরপুর শাখার একটি চেক দিলেও পরদিন পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় সেটি ডিজঅনার হয়। পরবর্তীতে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার পরও টাকা ফেরত না দেওয়ায় ভুক্তভোগী রমজান আলী দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট-এর ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেন।

মামলা হওয়ার পর আদালত থেকে বারবার সমন পাঠানো হলেও ক্ষমতার দাপটে তা পাত্তাই দেননি এই নারী পুলিশ সদস্য। ফলশ্রুতিতে, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শেরপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৭৫ ধারা মোতাবেক রোজিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করে শেরপুর পুলিশ সুপারের দপ্তরে পাঠান। কিন্তু অলৌকিক ইশারায় শেরপুর পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার না করে উল্টো নিরাপদ দূরত্বে বদলি করে দেয় জামালপুর পুলিশ লাইনে।

সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এবং পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB) স্পষ্ট বলছে—কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি তাৎক্ষণিক বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন। কিন্তু রোজিনার ক্ষেত্রে আইনের সেই ধারা যেন ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

ভুক্তভোগী রমজান আলী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “তিনি পুলিশের পোশাকের ভয় দেখিয়ে নিজেকে প্রভাবশালী দাবি করতেন। সরল বিশ্বাসে টাকা দিয়ে এখন আমি পথে বসেছি। আদালতের ওয়ারেন্ট থাকার পরও পুলিশ কেন তাঁদের নিজেদের সদস্যকে ধরছে না, তা আমার মাথায় আসছে না। আমি আইনি বিচার চাই।”

আইনি ব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে শেরপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, রোজিনার ওয়ারেন্টটি প্রথমে তাঁর নিজ জেলা নেত্রকোনায় পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে জামালপুরে পাঠানো হবে। অন্যদিকে জামালপুর জেলা পুলিশ সুপার ফারহানা ইয়াসমিনও পুরো দায় নেত্রকোনা পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, “তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনায়, সেখানে ওয়ারেন্ট পাঠানো হয়েছে। নেত্রকোনায় যোগাযোগ করেন।”

অবশ্য নিজের পিঠ বাঁচাতে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য রোজিনা আক্তারের দাবি, পাওনাদারের টাকা শোধ করার জন্য তিনি সময় চেয়েছেন। আর ৩ বছরের সাজার ব্যাপারে তিনি নাকি আকাশ থেকে পড়েছেন, কিছুই জানেন না! অপরাধ করে খোদ পুলিশের খাঁচায় বসে পার পেয়ে যাওয়ার এই ঘটনা এখন শেরপুর ও জামালপুরের টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। (ছবি: সংগৃহীত)

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *