তরুণীকে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা

তরুণীকে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানা এলাকায় ফুলদী নদী থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে উদ্ধার হওয়া এক তরুণীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ও গা শিউরে ওঠা রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), মুন্সীগঞ্জ জেলা। একই সঙ্গে এই বর্বরোচিত গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত চার নরপিশাচকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যারা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে হাজির হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি প্রদান করেছে। নিহত ওই তরুণীর নাম হালিমা আক্তার (১৯), সে গজারিয়ার হোসেন্দী ইউনিয়নের জামালদী গ্রামের মহাসিন বেপারীর মেয়ে।

পিবিআই ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ মে ২০২৬ খ্রিঃ তারিখ গজারিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল গজারিয়া থানাধীন টেংগারচর ইউ্নিয়নের বড় ভাটেরচর এলাকায় পশু ডাক্তার সাইফুল ইসলামের বসত বাড়ির পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে চলা ফুলদী নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় এক অজ্ঞাতনামা মহিলার মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে পিবিআই মুন্সীগঞ্জ জেলা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ভিকটিমের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই নৃশংস ঘটনায় নিহতের বোন হোসনেয়ারা আক্তার বৃষ্টি বাদী হয়ে ৩০ মে গজারিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের দিনই অর্থাৎ ৩০ মে তারিখে পিবিআই মুন্সীগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে এই চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং বর্তমানে পিবিআইয়ের দক্ষ এসআই (নিঃ) রনি দেবনাথ মামলাটির তদন্তভার পরিচালনা করছেন।

তদন্তভার গ্রহণের পর পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে জড়িত চার আসামিকে শনাক্ত করে গত ৩০ মে তারিখেই গজারিয়ার বড় ভাটেরচর এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলো—কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের উত্তর আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আম্বর আলীর ছেলে ও বর্তমানে বড় ভাটেরচরের ভাড়াটিয়া আবু কালাম (৪৮), বড় ভাটেরচর গ্রামের মো: ইছহাক আলীর ছেলে মো: জামাল হোসেন (৪৪), একই গ্রামের শিকদারবাড়ির মো: ধন মিয়ার ছেলে মো: রাসেল মিয়া (৪৪) এবং মৃত মনির হোসেনের ছেলে মো: আলামিন প্রধান (৫০)। গ্রেফতারের পর আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে তারা প্রত্যেকেই হালিমাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

তদন্তকালে প্রাপ্ত বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামিদের জবানবন্দি থেকে এই নৃশংস খুনের পেছনের ভয়ঙ্কর কারণ উদঘাটিত হয়েছে। জানা গেছে, প্রধান আসামি আবু কালামের নিকট ভিকটিম হালিমা আক্তার অনুমান ২৫ হাজার টাকা এবং অপর আসামি রাসেলের নিকট ১০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। এছাড়াও আসামী জামালের সাথে হালিমার শারীরিক সম্পর্ক বা পরকীয়া ছিল, যা ঘটনার কিছু দিন আগে জামালের এক নিকটাত্মীয় দেখে ফেলে। এতে হালিমা তাদের এই গোপন সম্পর্কের কথা এলাকায় অন্য কোথাও বলে দিতে পারে এবং তাতে সমাজে জামালের মানসম্মান ধুলোয় মিশে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তারা হালিমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ও পাওনা টাকা না দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এই নৃশংস ঘটনার অনুমান ১৫ দিন পূর্বে আসামী আবু কালাম, জামাল, রাসেল ও আলামিন একত্রে গজারিয়ার হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বসে হালিমা আক্তারকে হত্যার একটি নিখুঁত ও নিষ্ঠুর নীল নকশা বা পরিকল্পনা তৈরি করে। সেই পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক, গত ২৬ মে ২০২৬ খ্রিঃ তারিখ সন্ধ্যার পর কৌশলে আসামিরা হালিমাকে ডেকে বড় ভাটেরচর নদীর পাড়ে নিয়ে আসে। সেখান থেকে তারা একটি নৌকায় করে হালিমাকে নদীর ওপারে চকের ভেতরে একটি নির্জন ভুট্টা ক্ষেতের মাঝখানে নিয়ে যায়। সেখানে চার পাষণ্ড মিলে প্রথমে ভিকটিম হালিমাকে জোরপূর্বক পালাক্রমে গণধর্ষণ করে। পাশবিক নির্যাতন শেষে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে হালিমা আক্তারের পরনে থাকা টাইস বা প্যান্ট খুলে তা গলায় পেঁচিয়ে ফাঁশ দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে তারা মৃতদেহটি রাতের অন্ধকারেই ফুলদী নদীতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। পিবিআই জানিয়েছে, এই বর্বরোচিত ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটিত হলেও মামলার নিখুঁত ও আইনি তদন্ত কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *