স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির অবুঝ শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর মাথা কেটে আলাদা করার সেই হাড়হিম করা নৃশংসতায় এবার নতুন এক ‘নাটক’ সাজানোর চেষ্টা করছে প্রধান আসামি সোহেল রানা। এত দিন নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও, আজ সোমবার (১ জুন, ২০২৬) আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সে পুরো ঘটনার দায় ‘ডলার’ নামের অন্য এক রহস্যময় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে মামলাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে মোড় নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে আজ যখন এই বর্বরোচিত হত্যা মামলার চার্জগঠনের (অভিযোগ গঠন) শুনানি শুরু হওয়ার কথা, ঠিক তখনই সাংবাদিকদের ক্যামেরা আর ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক অভিনব চাতুরতা দেখাল এই খুনি।
আজ সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কড়া পুলিশি নিরাপত্তা। কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে সোহেল এবং কাশিমপুর কারাগার থেকে তার স্ত্রী ও মামলার অন্যতম আসামি স্বপ্না আক্তারকে যখন বেলা ১১টার পর ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তোলা হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই চিৎকার শুরু করে সোহেল রানা। গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্য করে সে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, রামিসাকে সে মারেনি বা ধর্ষণ করেনি, এটি করেছে ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তি, যে নাকি মিরপুর ১১ নম্বরের এক বিপুল অর্থবিত্তের মালিক এবং সে নাকি এই কাজের জন্য দুই লাখ টাকাও ছড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে সে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে এবং পুলিশের করা নিখুঁত তদন্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে দাবি করে যে, কোনো ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই নাকি চার্জশিটে ‘অটোমেটিক’ সব লিখে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গত ২৪ মে যে সুনির্দিষ্ট চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছেন, সেখানে সায়েন্টিফিক প্রমাণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার পরই সোহেল ও স্বপ্নার অপরাধের অকাট্য সত্যতা মিলেছে।
মামলার লোমহর্ষক বিবরণ মনে করিয়ে দেয়, গত ১৯ মে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা ঘর থেকে বের হলে এই দম্পতির নারী সদস্য স্বপ্না আক্তার তাকে ফুসলিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। পরে ঘরে একা পেয়ে শিশুটিকে পৈশাচিক নির্যাতন ও ধর্ষণ শেষে গলা কেটে হত্যা করে সোহেল রানা। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকহীন দেহ আর বাথরুমের বালতির ভেতরে লুকানো ছিল তার কাটা মাথা। ঘটনার পর জানালার গ্রিল কেটে পালালেও রক্ষা হয়নি, নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে ঠিকই গ্রেফতার করে পুলিশ। আইনি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা ও চার্জশিট জমার প্রধান চারটি ধাপ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সরকারি কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু জানিয়েছেন, এই নরপিশাচের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।
তবে এই মামলা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি বড় শঙ্কা কাজ করছে। জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুঁইয়ের মতে, নিম্ন আদালতে রায় দ্রুত হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে ডেথ রেফারেন্স সংগ্রহসহ বিভিন্ন আইনি মারপ্যাঁচে এই ধরনের মামলার রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর ঝুলে যায়। আজ আদালতে দাঁড়িয়ে সোহেল রানার এই নতুন চাল মূলত সেই আইনি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার ও ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচার একটি পরিকল্পিত কৌশল মাত্র। পল্লীবীর মানুষসহ পুরো দেশ এখন তাকিয়ে আছে আদালতের দিকে, যাতে এই চতুর খুনি কোনো মনগড়া গল্প ফেঁদে পার পেয়ে না যায় এবং শিশু রামিসার আত্মা দ্রুততম সময়ে সঠিক বিচার পায়। ফাইল ছবি সংগৃহীত।


