মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) :
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত নলভাঙ্গা এলাকায় কৃষি সেচের একটি ঐতিহ্যবাহী গভীর নলকূপ (ডিপ টিউবওয়েল) জোরপূর্বক দখল, আর্থিক হিসাব লোপাট এবং বহিরাগতদের মাধ্যমে প্রকৃত সদস্যদের হুমকি দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী সেচ সমিতির সদস্যরা। আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) বিকেলে নলভাঙ্গা বাজারের এক জনাকীর্ণ স্থানে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সদস্যরা নলকূপটির বৈধ মালিকানা ফিরিয়ে আনতে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে ২৫০ বিঘা জমির কৃষকদের বাঁচাতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সেচ সমিতির অন্যতম অংশীদার ও সদস্য শাহিনুর রহমান। এ সময় তাঁর সাথে সেচ প্রকল্পের অংশীদার শাহাজ্জেল হোসেন, জামির হোসেন, ইয়াকুব আলী ও আজিজুলসহ সমিতির মোট ১৫ জন সাধারণ সদস্য ও স্থানীয় কৃষকরা চাক্ষুষ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে সমিতির সদস্যরা জানান, সুদূর ১৯৮৪ সালে গ্রামের অবহেলিত কৃষি ব্যবস্থার অগ্রগতির লক্ষ্যে ২১ জন প্রান্তিক চাষী মিলে বিআরডিবি নিয়ন্ত্রনাধীন একটি ইঞ্জিন চালিত গভীর নলকূপ গঠন করেন। নলকূপটি তৎকালীন সময়ে নলভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ আলী বিশ্বাসের জমিতে স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর থেকে এই নলকূপের সেচ সুবিধার অধীনে প্রায় ২৫০ বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসলের চাষাবাদ হয়ে আসছিল। শুরুর দিকে সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জমিরুল ইসলাম নামে এক সদস্য এটি অত্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালনা করতেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত কয়েক বছর পর একটি অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনায় নলকূপের ফ্যানে জড়িয়ে জমিরুল ইসলামের দুটি হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু হয়ে যায়।
জমিরুলের এই আকস্মিক দুর্ঘটনার পর, মানবিক কারণে এবং জমির মালিকানার সূত্র ধরে সৈয়দ আলী বিশ্বাসের ছেলে মাহবুবুর রহমানকে সাময়িকভাবে নলকূপটি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে সমিতি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মাহবুবুর রহমানের মনে লোভের সঞ্চার হয়। তিনি কৌশলে ও চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে সমিতির নামে থাকা সেচ মিটারটি পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নিজের নামে করে নেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০১৫ সালে মাহবুবুর রহমান তৎকালীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা কালাম চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় ইউপি মেম্বার কামাল হোসেনের সরাসরি মদদে ও নেতৃত্বে জোরপূর্বক গভীর নলকূপটি সম্পূর্ণ নিজের একক নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ১০ বছরেরও অধিক সময় ধরে এই নলকূপ থেকে অর্জিত আয়ের কোনো লভ্যাংশ বা হিসাব সাধারণ সদস্যদের না দিয়ে সম্পূর্ণ টাকা একা ভোগ করে আসছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। এই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
সমিতির সদস্যরা আরও জানান, দীর্ঘদিনের শোষণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদে এবং চাষাবাদের স্বার্থে সর্বশেষ চলতি বছরের জুন মাসে স্থানীয় সর্বস্তরের কৃষকদের সাথে এক জরুরি মতবিনিময় করে প্রকৃত সমিতির সদস্যরা একতাবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তারা নলকূপটি পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু এরপর থেকেই চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে মাহবুবুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে প্রকৃত চাষীদের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপপ্রচার ও গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিরোধের জেরে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার শালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও মাহবুবুর রহমান কোনো সঠিক হিসাব দিতে না পারায় কোনো সুরাহা হয়নি। একপর্যায়ে বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালে উভয় পক্ষকে নিয়ে থানায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই থানা বৈঠকের বাইরে এসে জালাল উদ্দীন ও আজিজুল লস্কর নামে দুই ব্যক্তি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নলকূপের দখল পুনরায় মাহবুবুর রহমানকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সমিতির সদস্যদের প্রকাশ্য হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে এসে সমিতির সদস্যরা উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “এই গভীর নলকূপটি কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, এটি ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা ২১ জন সদস্য ও ২৫০ বিঘা জমির কৃষকদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। আমরা এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সকল প্রকার অবৈধ হুমকি ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বন্ধ করে নলকূপটির নিয়মতান্ত্রিক দায়িত্ব প্রকৃত সমিতির সদস্যদের হাতে সম্পূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের জোর দাবি জানাচ্ছি।” ছবি সংগৃহীত।


