উন্নয়ন বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ঝিনাইদহবাসী

উন্নয়ন বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ঝিনাইদহবাসী

মো. মাসুদ রানা, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা এবং উর্বর কৃষিজমির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও দেশের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা ঝিনাইদহ উচ্চশিক্ষা, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামোতে এখনো চরমভাবে উপেক্ষিত। দীর্ঘদিন ধরে চলা উন্নয়ন বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ঝিনাইদহে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জেলাকে রেললাইনের নেটওয়ার্কের আওতায় আনার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সর্বস্তরের ঝিনাইদহবাসী। এসব জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে জেলার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— এই অঞ্চলের গৌরব বিপ্লবী বাঘা যতীনের নামে ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের নামে একটি বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।

এছাড়াও জেলা সদর ও এর গুরুত্বপূর্ণ উপজেলাগুলোকে জাতীয় রেলপথের আওতায় আনা, কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে তোলা, বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা এবং জেলার ঐতিহ্যবাহী নদ-নদী, খাল-বিল, বাঁওড় ও জলাশয়গুলো দখলমুক্ত করে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক সংস্কার আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জেলায় উন্নত ও আধুনিক রেলপথ না থাকায় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় গুণতে হচ্ছে, যার ফলে কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা না থাকায় যেকোনো জটিল রোগীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রতিবেশী জেলা যশোর, কুষ্টিয়া কিংবা রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। এতে পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে এবং সাধারণ পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আন্দোলনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাংবাদিক সুজন বিপ্লবের একক উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে ঝিনাইদহে রেললাইন, মেডিকেল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন শুরু হয়। বিগত দেড় দশক ধরে এই দাবিতে মানববন্ধন, গণ-স্বাক্ষর, বিক্ষোভ সমাবেশ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। সময়ের ব্যবধানে এই যৌক্তিক আন্দোলনে ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, ক্ষেতমজুর সমিতি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সিপিবিসহ জেলার বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনjenaida

আন্দোলনকারীদের গভীর ক্ষোভ, দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চললেও মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রেল সংযোগের মতো ঝিনাইদহবাসীর অতি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণের দাবিগুলো বাস্তবায়নে এখনো সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জেলার সর্বস্তরের মানুষের আবেগ ও অধিকারের বিষয় হওয়ায় আসন্ন জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে ঝিনাইদহের এই উন্নয়ন-সংক্রান্ত দাবিগুলো প্রধান নির্বাচনী ইস্যু বা ট্রাম্পকার্ড হয়ে উঠতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন সচেতন নাগরিক জানান, দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত এই দাবিগুলোর দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি বা সরকারি ঘোষণা না এলে জেলার এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আগামীতে আরও ব্যাপক ও গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। তাই জেলার সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনস্বার্থ বিবেচনায় অনতিবিলম্বে এসব প্রকল্প বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের নীতি-নির্ধারকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ঝিনাইদহবাসী। ছবি মো. মাসুদ রানা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *