চিপস কারখানায় মধ্যরাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : শর্টসার্কিট কেড়ে নিল দুই তরুণের স্বপ্ন!

চিপস কারখানায় মধ্যরাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : শর্টসার্কিট কেড়ে নিল দুই তরুণের স্বপ্ন!

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :

রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় গভীর রাতে একটি চিপস তৈরির কারখানায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মধ্যরাতের এই আকস্মিক ও লেলিহান আগুনের গ্রাসে কারখানার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা মোস্তফা (২১) ও মাহমুদুল হাসান (২৩) নামে দুই তরুণ শ্রমিক কর্মচারী আগুনে দগ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আজ সোমবার (২৫ মে) ভোর সোয়া ৪টার দিকে পূর্ব বাড্ডা কবরস্থান রোডে অবস্থিত ‘মারিয়া আব্দুল্লাহ ফুড’ নামের ওই চিপস কারখানা থেকে আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া দুই কর্মচারীর দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, আজ রাত আনুমানিক ২টার দিকে কারখানার নিচতলায় এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটে।

অগ্নিকাণ্ডের এই মর্মস্পর্শী ঘটনায় নিহত দুই কর্মচারীর বাড়িই রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলায় বলে থানা সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে নিহত মাহমুদুল হাসানের পিতার নাম ইসলাম উদ্দিন এবং অপর নিহত তরুণ মোস্তফার পিতার নাম মজনু মিয়া। জীবিকার তাগিদে ঢাকার এই চিপস কারখানায় এসে অল্প বয়সেই তাদের এমন ট্র্যাজিক ও অঙ্গার হয়ে মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবার ও স্বজনদের মাঝে এক বুকফাটা হাহাকার এবং পুরো তারাগঞ্জ উপজেলা জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কারখানার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া অপর কর্মচারী মো. রাকিবুল ইসলাম অগ্নিকাণ্ডের সেই লোমহর্ষক মুহূর্তের বিবরণ দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, পূর্ব বাড্ডা কবরস্থান রোডের মালিক আমিরুল ইসলামের মালিকানাধীন টিনশেড দোতলা ‘মারিয়া আব্দুল্লাহ ফুড’ কারখানায় তারা বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ ও রাতে সেখানেই বসবাস করেন। ঘটনার রাতে ওই কারখানার ভেতরে মোট ১০ জন কর্মচারী অবস্থান করছিলেন। প্রতিদিনের ন্যায় গত রবিবার (২৪ মে) রাত ১০টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে তারা সবাই কারখানার দোতলার থাকার ঘরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এরপর রাত আনুমানিক ২টার দিকে হঠাৎ করে প্রচণ্ড গরম হাওয়া, চারদিকের পোড়া গন্ধ এবং ঘন কালো ধোঁয়ায় তাদের দম বন্ধ হয়ে ঘুম ভেঙে যায়। একই সাথে কারখানার নিচতলা থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যান্য শ্রমিক ও পথচারীদের তীব্র চিৎকার ও চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পান তারা। এ সময় তীব্র ধোঁয়া ও আগুনের শিখা ডিঙিয়ে কারখানার ভেতরে থাকা ৮ জন কর্মচারী কোনোমতে অলৌকিকভাবে বাইরে বের হতে পারলেও, দোতলার এক কোণে ঘুমিয়ে থাকা মোস্তফা ও মাহমুদুল হাসান তীব্র ধোঁয়ায় জ্ঞান হারিয়ে আগুনের কুন্ডলীর মধ্যে আটকা পড়েন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার পর দোতলার পুড়ে যাওয়া কক্ষ থেকে তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।

রাজধানীর বাড্ডা থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আজহারুল ইসলাম অগ্নিকাণ্ডের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ও দুই শ্রমিকের মৃত্যুর সত্যতা দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করে স্পষ্ট ভাষায় জানান, রাত ২টার দিকে বাড্ডা কবরস্থান রোডের ওই টিনশেড চিপস কারখানায় মূলত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সুনির্দিষ্ট সূত্রপাত ঘটে। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক চৌকস ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় জনতার সহায়তায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। তবে কারখানার ভেতরে দাহ্য পদার্থ ও চিপস তৈরির তেলের কারণে আগুন দ্রুত দোতলায় ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা দুই কর্মচারীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ রাতেই কারখানার ভেতর থেকে দুই কর্মচারীর দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ঢামেক মর্গে পাঠিয়েছে। এই ঘটনায় কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক লাইনে কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ তদন্ত কমিটি। বাড্ডা থানায় একটি নিয়মিত অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে চলমান রয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে থানা প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। সংগৃহীত ফাইল ছবি।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *