স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
টাকা দিলে নাকি বাঘের চোখও মেলে, কিন্তু টাকা দিলে যে অন্যের হয়ে জেলও খাটা যায়— তা প্রমাণ করে দিলেন নরসিংদীর ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধ হারুন মিয়া। সিনেমার টানটান থ্রিলার স্ক্রিপ্টকেও হার মানানো এই অভিনব জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী জেলা আদালতে।
টাকার চুক্তিতে মানব পাচার মামলার মূল আসামি সেলিম মিয়ার (৪৫) ‘প্রক্সি’ বা বদলি হিসেবে দীর্ঘ ১ মাস ৬ দিন (৩৬ দিন) অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটান হারুন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে যেই না ফটকের বাইরে পা রেখেছেন, অমনি ওত পেতে থাকা পুলিশের টিম তাকে আবার গ্রেপ্তার করে নতুন গারদে পুরেছে।
আদালতের নথি বলছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের রায়পুরার একটি মানব পাচার মামলাকে কেন্দ্র করে। গত ১২ এপ্রিল সেই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান মামলার তিন আসামি— জামির উদ্দিন, সেলিম মিয়া ও ফাতেমা। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু কপালে ভাঁজ পড়ে কারা কর্তৃপক্ষের। ‘সেলিম মিয়া’ নামের কয়েদির আচরণ আর চেহারায় মিলছিল না আসল আসামির হদিস। ভেতরে ভেতরে শুরু হয় নিবিড় খোঁজখবর। আর তাতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল! জানা যায়, কারাগারে থাকা ব্যক্তিটি আসলে প্রকৃত আসামি সেলিমই নন; তিনি রায়পুরার মাহমুদনগর এলাকার দিনমজুর হারুন মিয়া। আসল আসামি সেলিম মিয়া বিপুল অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে এই বৃদ্ধকে নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন!
একজন জঘন্য অপরাধীর পরিবর্তে নিরপরাধ বা ভাড়াটে বৃদ্ধের জেল খাটার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য যখন আদালতে পৌঁছায়, তখন পুরো আদালত পাড়ায় তোলপাড় শুরু হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং পুলিশের চিরুনি অভিযানের মুখে পড়ার ভয়ে গতকাল সোমবার (১৮ মে) আসল আসামি সেলিম মিয়া নিজেই তড়িঘড়ি করে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। বিচারক তাকে তাৎক্ষণিক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একই দিন নরসিংদীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ আলী আহসান প্রক্সি দেওয়া বৃদ্ধ হারুন মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। তবে, আদালতকে এমন চরম বিভ্রান্ত ও জালিয়াতি করার অপরাধে এই বৃদ্ধের বিরুদ্ধে একটি নতুন নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করার কড়া নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নরসিংদী সদর থানা পুলিশ ফাঁদ পাতে জেলা কারাগারের মেইন গেটে। আজ মঙ্গলবার সকালে যেই মুহূর্তে হারুন মিয়া ভাবছিলেন তিনি ৩৬ দিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরছেন, ঠিক তখনই কারাফটকে তাঁর হাতে পুনরায় হাতকড়া পরায় পুলিশ।
নরসিংদী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আর মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আদালতকে ধোঁকা দেওয়ার অপরাধে হারুনের বিরুদ্ধে নতুন জালিয়াতি মামলা রুজু করে তাকে আবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট শিরিন আক্তার বলেন, “একজনের বদলে আরেকজন সাজা ভোগ করবে— এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী। এই চক্রের পেছনে কোনো আইনজীবীর হাত বা গাফিলতি আছে কি-না, তা বার কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।” ছবি সংগৃহীত।

