ডাঃ কেরামত আলী, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
পবিত্র ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাতক্ষীরা সদর এলাকায় ৮ বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণির এক অবুঝ কন্যাশিশুকে পেয়ারা দেওয়ার প্রলোভনে ছাদে ডেকে নিয়ে বর্বরোচিত ও পাশবিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর অসুস্থ ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে প্রথমে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও বর্তমানে সে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত রবিবার (১২ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যার দিকে সদর থানা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক অপরাধের ঘটনাটি ঘটে।
এই বর্বরোচিত ঘটনার পর পুরো সাতক্ষীরা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরদিন সোমবার বিকেল ৫টার দিকে ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি নিয়মিত ধর্ষণ মামলা দায়ের করেছেন।
পুলিশ, হাসপাতাল ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার এই শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত রবিবার সন্ধ্যার দিকে তাদের পাশের বাড়ির এক কিশোর তাকে মিষ্টি পেয়ারা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবেশীর একটি ফাঁকা বাড়ির ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে ছাদের নির্জনতার সুযোগ নিয়ে ওই অবুঝ ও কোমলমতি শিশুটির ওপর চড়াও হয় এবং পাশবিক ধর্ষণ চালায়। একপর্যায়ে শিশুটি যন্ত্রণায় তীব্র চিৎকার ও কান্না শুরু করলে অবক্ষয়গ্রস্ত ওই কিশোর তাকে ছাদ থেকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে।
এই সময় শিশুটির কান্নার আওয়াজ পেয়ে তার এক দূরসম্পর্কের চাচি দ্রুত ওই বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলে অপরাধের চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে যান। ওই নারীকে সামনে আসতে দেখে অভিযুক্ত কিশোর তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কিশোরটি এলাকার একটি মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এদিকে পাশবিক নির্যাতনের কারণে শিশুটির শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে স্বজনেরা তাকে দ্রুত রাত ১০টার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে তাকে চার চারটি সেলাই দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় উন্নত ও নিবিড় চিকিৎসার জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর (রেফার্ড) করেন।
শিশুটির বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, “রবিবার রাতে যখন শিশুটিকে আমাদের এখানে আনা হয়, তখন তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং সে চরম ট্রমার মধ্যে ছিল। আমরা দ্রুত চারটি সেলাই দিয়ে রক্তক্ষরণ সামাল দেওয়ার প্রাথমিক চেষ্টা করেছি। তবে তার অভ্যন্তরীণ আঘাত অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় উন্নত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
বর্তমানে শিশুটির শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান কামরুন নাহার জানান, “মেয়েটির নিবিড় চিকিৎসা চলছে। তবে আঘাতের গভীরতা এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে এখনই তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। আরও দুই-একদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর সার্বিক পরিস্থিতি স্পষ্ট করে জানানো সম্ভব হবে।”
বর্বরোচিত এই ঘটনার খবর পেয়ে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে গিয়ে ভুক্তভোগী শিশু ও তার স্বজনদের সাথে কথা বলে মামলার প্রাথমিক ডায়েরি ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন সাতক্ষীরা সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) প্রদীপ কুমার।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “একটি অবুঝ শিশুর ওপর এই ধরনের পাশবিক নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিশুর মা বাদী হয়ে সোমবার বিকেলে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। আমরা পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সাথে দেখছি। অপরাধী কিশোর হলেও তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না; তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।” ফাইল ছবি সংগৃহীত।

