এখনো অধরা কুখ্যাত অস্ত্র-মাদক কারবারি ছাত্রলীগ নেতা নাসির!

এখনো অধরা কুখ্যাত অস্ত্র-মাদক কারবারি ছাত্রলীগ নেতা নাসির!

ডাঃ মোঃ কেরামত আলী, কালীগঞ্জ (সাতক্ষীরা) থেকে :

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় গত ৩ মাসে দেশি-বিদেশি ৩টি পিস্তলসহ ৫ জন দুর্ধর্ষ ডাকাত ও ছিনতাইকারী আটক হলেও, আড়ালে থেকে যাওয়া মূল হোতা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা, জেলার শীর্ষ মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন এবং তার সিন্ডিকেট রহস্যজনক কারণে রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া এক ডাকাতের জবানবন্দিতে অস্ত্র বিক্রেতা হিসেবে নাসিরের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উঠে আসলেও, তার স্ত্রী যুবলীগ নেত্রী আজমিরা খাতুন ওরফে পাখি ও মাদকাসক্ত ভাই মোহনকে আজও পুলিশ আটক করতে পারেনি। অনুসন্ধানে এই চক্রের এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নাসির গংয়ের মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান কাজে একাধিক সুন্দরী যুবতী নারীকে ব্যবহার করা হতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদক বহন ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলতে ‘হানিট্র্যাপ’ এর কাজে ব্যবহার করা হতো ওই সমস্ত নারীদের। শুধু ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবীই নয়, থানা পুলিশের অনেক সদস্যকেও এই হানিট্র্যাপের ফাঁদে ফেলে নির্জন ফ্ল্যাটে ডেকে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও গোপনে ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হতো, যাতে নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য নিরাপদে রাখা যায়। শ্যামনগরের ফারুক মিস্ত্রির মেয়ে রুমাসহ বহু তরুণীকে প্রেম ও বিয়ের আশ্বাসে ভোগ করে পরবর্তীতে কলগার্ল ও মাদককারবারি হতে বাধ্য করেছে এই নাসির।

এমনকি নাসিরের কথামতো না চলায় তার প্রথম স্ত্রী মাসুরা খাতুনকে মিথ্যা মাদক ও ডাকাতি মামলায় ফাঁসিয়ে কোলের শিশু সন্তানসহ জেল খাটানো হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে স্ত্রীর দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় (কালীগঞ্জ থানা মামলা নং-১৬, তারিখ: ১৮/০১/১৮) নাসিরের বাবা-মা ও ভাই গ্রেপ্তার হলেও নাসির অধরাই থেকে যায়। পরবর্তীতে স্ত্রীর মামলা থেকে বাঁচতে তৎকালীন পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান এবং ওসির নির্দেশে, নাসিরের হানিট্র্যাপের শিকার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই কামালকে দিয়ে ফিল্মী স্টাইলে আদালত চত্বর থেকে মাসুরাকে শিশু সন্তানসহ গ্রেপ্তার করিয়ে এক ডাকাতি মামলায় খালাস পাওয়ার ন্যাক্কারজনক অভিযোগ রয়েছে নাসিরের বিরুদ্ধে।

আওয়ামী স্বৈরশাসনের সময়ে সাতক্ষীরা সদর ও কালীগঞ্জ থানার সাবেক ওসি এমদাদের ‘ক্যাশিয়ার’ ও পার্টনার খ্যাত এই নাসির ছিল পুরো জেলার টক অব দ্য টাউন। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে জামায়াত-বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের মধ্যস্থতা করত সে। পরবর্তীতে একাধিক বিয়ে করা আজমিরা সুলতানা ওরফে পাখিকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করে তাকে জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বানায় এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে ছবি তুলে সেই সখ্যতাকে পুঁজি করে দেদারসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। নিজেকে বাঁচাতে ভুঁইফোড় সাংবাদিক সংগঠনের ব্যানারে কথিত রিপোর্টার্স ইউনিটের সভাপতি পরিচয় দিয়ে থানার সামনে নাজিমগঞ্জ বাজারে অফিস খুলে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত সে।

গত ২৭ মার্চ কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামে র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ইতালির তৈরি ৭.৬৫ বোরের পিস্তল, ৬ রাউন্ড গুলি, ওয়াকিটকি ও ৯০০ পিস ইয়াবাসহ ডাকাত ইয়ার আলী, বাহার, রেজাউল ও উজ্জ্বল আটক হয় (কালীগঞ্জ থানা মামলা নং-২৩ ও ২৪)। এই মামলায় ৭ দিনের রিমান্ড শেষে গত ৭ এপ্রিল বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলামের খাস কামরায় স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় হত্যাসহ দুই ডজন মামলার আসামি ডাকাত ইয়ার আলী। জবানবন্দিতে সে স্বীকার করে, অমল মাস্টারের জায়গা দখলের জন্য রওশন কাগুজি ও ইদ্রিস কাগুজি তাকে ভাড়া করে। সেই দখলের জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন হলে কালীগঞ্জের মৌতলার ছাত্রলীগ নেতা নাসিরের ঘেরের বাসা থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দিয়ে সে ১টি পিস্তল ও ৭ রাউন্ড গুলি কেনে।

এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ২ মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অস্ত্র বিক্রেতা নাসিরকে পুলিশ গ্রেপ্তার না করায় এলাকায় খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি ও প্রতিনিয়ত ককটেল বিস্ফোরণসহ সহিংস কার্যকলাপ বেড়েই চলেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, নাসিরের বিক্রি করা বাকি অস্ত্র ও গুলি কোথায়? বর্তমানে এই অপরাধ থেকে জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে নিতে নৌবাহিনী থেকে কোর্ট মার্শালে বরখাস্ত হওয়া নাসিরের সহযোগী ইউটিউবার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে মোটা অঙ্কের টাকায় ভাড়া করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। বর্তমানে নাসিরের অবর্তমানে তার স্ত্রী পাখি এই মাদক ব্যবসার দেখভাল করছে বলে জানা গেছে।

আদালতের রায়ের ডিগ্রিকৃত ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা প্রথম স্ত্রীকে পরিশোধ না করায় নাসিরের বিরুদ্ধে আদালতের ওয়ারেন্ট এবং অস্ত্র মামলায় ইয়ার আলীর ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে না ধরে উল্টো আগাম অভিযানের খবর দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে অস্ত্র ব্যবসায়ী নাসিরের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপারের নিকট প্রথম স্ত্রী মাসুরার দায়ের করা লিখিত অভিযোগের তদন্ত আগামী ১৫ জুলাই সকাল ১০টায় দেবহাটা থানায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেলাব্যাপী নাসিরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং এই চক্রের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার, খুলনা বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার, আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আশু ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কালীগঞ্জ উপজেলার সর্বস্তরের ভুক্তভোগী অধিবাসী। ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *