শেষ হলো লাখো মানুষের কান্নার এক কালো অধ্যায়

শেষ হলো লাখো মানুষের কান্নার এক কালো অধ্যায়

কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:

ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গাসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে এক রাতে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া, লাখো মানুষকে সুকৌশলে নিঃস্ব করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া কুখ্যাত ও আলোচিত ‘হুন্ডি কাজল’ অধ্যায়ের চিরতরে সমাপ্তি ঘটেছে। ১৯৯০-এর দশকের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল হোতা ফারুক আহমেদ কাজল ওরফে ‘হুন্ডি কাজল’ (৭৫) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আজ ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) দুপুরের দিকে ভারতের স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাঁর দাফন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এই চাঞ্চল্যকর খবরটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

পারিবারিক ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার (২৪ জুন) রাত ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ থানা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফারুক আহমেদ কাজল মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক লিভার ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন বলে জানা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের পর ভারতের মাটিতেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে বলে কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা ও তাঁর আপন ছোট ভাই বিখ্যাত কবি চঞ্চল শাহরিয়ার সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, আশির দশকে স্থানীয় মাঠে একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। তবে ফুটবলের মাঠ ছেড়ে ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি আন্তর্জাতিক চোরাচালান ও অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। অস্বাভাবিক ও অলৌকিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ঝিনাইদহ ও যশোর অঞ্চলে গড়ে তোলেন এক বিশাল সমবায় ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।

তাঁর সেই লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে কৃষক, চাকরিজীবী, বিধবা নারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের শেষ সম্বল জমিজমা, ভিটেমাটি ও স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা লগ্নি করেন। স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ও অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ এক রাতে আত্মসাৎ করে হঠাৎ করেই পুরোপুরি আত্মগোপনে চলে যান কাজল।

কাজলের এই অর্থ কেলেঙ্কারির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি পথের ভিখারিতে পরিণত হয়। আর্থিক ক্ষতির তীব্র শোক সইতে না পেরে সে সময় স্ট্রোক করে মারা যান শত শত বৃদ্ধ, অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। লগ্নীকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনাখুনির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক রূপ ধারণ করেছিল যে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নিজে কোটচাঁদপুর সফর করে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা উদ্ধারের কড়া আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত সেই লুণ্ঠিত অর্থের এক আনাও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অর্থ কেলেঙ্কারির পর কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ বিভিন্ন থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ডজনখানেক মামলা দায়ের হয়। এক পর্যায়ে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও তদবিরের জোরে আদালত থেকে জামিন লাভ করেন এবং গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি এক ভারতীয় নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করে স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

কাজলের ছোট ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার বলেন, “আমাদের মূল পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন—এ তথ্য সত্য।” এদিকে, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কোটচাঁদপুরের সলেমান গ্রামে অবস্থানরত তাঁর প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক জালিয়াতি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর নামে আমাদের থানাতেই ৫টি স্থায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল।” হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, সর্বস্ব হারানো হাজারো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও বেদনার স্মৃতি আজও ঝিনাইদহের বাতাসে গভীরভাবে ভাসছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *