স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর শহরের স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতাল ‘নোভা মেডিকেল সেন্টার’-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বৃদ্ধা রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল ইনজেকশন দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলে মৃত রোগীর ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের ভেতরে ব্যাপক হাঙ্গামা চালান। এ সময় কর্তব্যরত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর অতর্কিত হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে ৩ জন নামী চিকিৎসক এবং ২ জন নার্স মারাত্মকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ ১৯ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ শুক্রবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত যশোর শহরের নোভা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করে।
হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র জানায়, যশোর শহরের শংকরপুর চোপদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমানের স্ত্রী নাসিমা খাতুন (৭০) দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। এছাড়া ক্যানসারের পাশাপাশি তিনি বার্ধক্যজনিত হৃদরোগ (হার্টের সমস্যা) ও তীব্র ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত শনিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নোভা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকার মহাখালী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আশিকুর রহমান গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নোভা হাসপাতালে তাঁর একটি জটিল অস্ত্রোপচার (অপারেশন) সম্পন্ন করেন। সফল অস্ত্রোপচার শেষে রোগীকে হাসপাতালের ৬০৫ নম্বর কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, আজ শুক্রবার ভোরের দিকে ক্যানসার আক্রান্ত নাসিমা খাতুন কেবিনে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে পরিবারের সদস্যরা কর্তব্যরত নার্সকে ডাকেন। নার্স এসে তাকে একটি ব্যথানাশক ইনজেকশন পুশ করেন। এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে নাসিমা খাতুনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার মারজিয়া কেবিনে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাসিমা খাতুনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সাথে আসা স্বজনেরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাদের সরাসরি অভিযোগ, নার্স ভুল ইনজেকশন দেওয়ার কারণেই মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে স্বজনদের তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত স্বজনেরা লাঠিসোটা নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে দায়িত্বরত মেডিকেল স্টাফদের ওপর চড়াও হন এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন।
উত্তেজিত জনতার এই হামলায় ক্যানসার রোগীর মূল চিকিৎসক ও ঢাকার সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আশিকুর রহমান, হাসপাতালের ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. অনুপ কুমার রায়, ডা. মো. মনিরুজ্জামান এবং কেবিনে ডিউটিরত দুইজন নার্স আহত হন। হাসপাতালের ভেতরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মারধরের ঘটনায় অন্যান্য সাধারণ রোগীদের মধ্যেও তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে খোদ মৃত রোগীর স্বামী মিজানুর রহমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ক্ষুব্ধ স্বজনদের শান্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সকালের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং জোহরের নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
নোভা হাসপাতালের ম্যানেজার রিয়াজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “রোগীকে সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে কেবল ব্যথানাশক ও প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। ৭০ বছর বয়স এবং শরীরে ক্যানসার, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো একাধিক মারাত্মক জটিলতা থাকার কারণেই আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকদের ধারণা। রোগীর চিকিৎসায় বা নার্সিং সেবায় বিন্দুমাত্র কোনো অবহেলা বা ভুল ছিল না।”
আক্রান্ত ও আহত চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আশিকুর রহমান গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নাসিমা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে আমার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সাথে আমাদের অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী তাকে ব্যথানাশক ও গ্যাসের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোগীর স্বজনরা কেবিনে পড়ে থাকা ডিস্টিল ওয়াটার (মিক্সিং পানি)-এর খালি অ্যাম্পুল ও ব্যবহৃত সিরিঞ্জ সামগ্রী দেখে ভুল বুঝে চার-চারটি ইনজেকশন পুশ করার মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন, যা মোটেও সঠিক নয়।” সুস্থ পরিবেশের মধ্যে একজন চিকিৎসকের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তিনি তীব্র মানসিক কষ্ট পেয়েছেন বলে জানান।
এদিকে ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে দিনভর তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. শেখ ফারুক আহমেদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আজ রাত পর্যন্ত এই হামলার ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো নিয়মিত মামলা বা যশোর কোতোয়ালী মডেল থানায় আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

