শহিদ জয়:
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা, চরম সমন্বয়হীনতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাবের তীব্র অভিযোগ তুলে যশোরে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। দলটির জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা কমিটির একাধিক শীর্ষ ও হেভিওয়েট নেতাসহ ১৬ জন প্রভাবশালী নেতা একযোগে দল থেকে স্বেচ্ছায় গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। আজ ১৯ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ‘প্রেসক্লাব যশোর’ মিলনায়তনে আয়োজিত এক জরুরি ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তারা সম্মিলিতভাবে দলত্যাগের এই চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। এই গণপদত্যাগের ফলে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগকারী ক্ষুব্ধ নেতারা তাঁদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্যে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, বিগত দীর্ঘ বছর ধরে তারা নিজেদের শ্রম, অর্থ ও মেধা দিয়ে যশোরে জাতীয় পার্টিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং জনগণের কল্যাণে রাজপথে কাজ করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার চরম অভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অসাংগঠনিক, একগুঁয়েমি ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান ভঙ্গুর ও সমন্বয়হীন অবস্থায় জাতীয় পার্টি দেশ এবং দেশের সাধারণ জনগণের জন্য কোনো ধরনের কার্যকর বা ইতিবাচক রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
এমন এক দমবন্ধ ও হতাশাজনক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা দলের নীতিহীন কর্মকাণ্ডের অংশীদার না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ১৯ জুন ২০২৬ তারিখ থেকে জাতীয় পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের সাংগঠনিক পদ-পদবি, দায়িত্ব এবং সম্পর্ক থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ ও চিরতরে অব্যাহতি নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তারা।
যশোরে দলত্যাগের এই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মূল চালিকাশক্তিরা। পদত্যাগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শীর্ষ নেতারা হলেন— যশোর জেলা জাতীয় পার্টির সম্মানিত আহ্বায়ক আলহাজ আজিজুর রহমান আজিজ, সদস্য সচিব ডা. মুফতি ফিরোজ শাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল, এম এ হালিম ও জি এম হাসান। জেলা কমিটির পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ তিন কান্ডারিও লাঙ্গল প্রতীক ত্যাগ করেছেন, তারা হলেন— কেশবপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ডা. আক্তারুজ্জামান আক্তার, শার্শা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো: শফিয়ার রহমান এবং যশোর সদর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো: হাবিবুর রহমান হাবিব।
জেলা ও উপজেলার এই শীর্ষ আট নেতা ছাড়াও দলটির বিভিন্ন উইং ও অঙ্গসংগঠনের আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা একযোগে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। অন্য পদত্যাগকারী নেতারা হলেন— রুহুল আমিন লাভলু, ইমন হোসেন লাল্টু, আমিনুর রহমান, বিল্লাল হোসেন, মিজানুর রহমান, রবিউল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, হাফিজুর রহমান, বজলুর রহমান, ডা. জামাল উদ্দিন, মফিজুর রহমান, একরামুল হক জুয়েল, আবু হারেজ, ওসমান গণি সরকার, সেকেন্দার আলী ও মাস্টার ফিরোজ।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে পদত্যাগকারী শীর্ষ নেতারা জানান, জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করলেও তারা এখনই নতুন কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন না। ভবিষ্যতে তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করবেন নাকি অন্য কোনো বড় দলে শামিল হবেন, তা সম্পূর্ণভাবে আগামী দিনের সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অনুসারী নেতা-কর্মীদের মতামতের ওপর নির্ভর করবে। সংবাদ সম্মেলনে যশোর জেলা জাতীয় পার্টির সদ্য বিদায়ী সদস্য সচিব ডা. মুফতি ফিরোজ শাহ উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে মূল লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় যশোর ও খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের বিপুল সংখ্যক প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ছবি সংগৃহীত।

