বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া:
পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল কলাপাড়া উপজেলায় আধুনিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও মৌলিক অধিকার ‘বিদ্যুৎ সুবিধা’ থেকে স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সময় পরও বঞ্চিত রয়েছে একটি প্রত্যন্ত জনপদের বেশ কয়েকটি পরিবার। উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের মধ্যলোন্দা গ্রামের প্রায় ১০টি প্রান্তিক ও সাধারণ পরিবার আজও গ্রিডের বিদ্যুতের আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে চরম অন্ধকারের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। দেশের শতভাগ বিদ্যুতায়নের মহতী উদ্যোগের মাঝেও এই পরিবারগুলোর ঘরে বিদ্যুতের আলো না পৌঁছানোয়, চলমান তীব্র তাপদাহ ও প্রচণ্ড তাপদাহের মাঝে তারা নানাবিধ দুর্ভোগ ও মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ পাওয়ার আকুতি জানিয়েও কোনো সুরাহা না হওয়ায়, অবশেষে গতকাল ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একত্রিত হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের দাবিতে নিজ গ্রামে এক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। উপকূলীয় এই তীব্র গরমে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের শারীরিক অসুস্থতা এবং অন্ধকার ঘরে বসবাসের এই অবর্ণনীয় কষ্টের চিত্র দেখে স্থানীয় সচেতন মহলের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের বিবরণ থেকে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিত থাকা এই হতদরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রধানদের মধ্যে রয়েছেন—মোস্তফা মৃধা, শাহিন মৃধা, জাহিদুল মৃধা, সেকেন্দার মৃধা, আসলাম হাওলাদার, রফিক হাওলাদার, নাছের মৃধা, স্বপন মৃধা ও শিপন মৃধা। বিদ্যুৎহীন এই প্রতিটি পরিবারেরই নিজস্ব ও স্থায়ী বসতঘর রয়েছে এবং তাদের চারপাশের অন্য সব এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ থাকলেও, এক অদৃশ্য কারণে বা ভৌগোলিক জটলা দেখিয়ে এই ১০টি পরিবারকে সম্পূর্ণ সংযোগহীন করে রাখা হয়েছে।
বিক্ষোভ চলাকালে ভুক্তভোগী মোস্তফা মৃধা ও শাহিন মৃধা অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের কাছে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনে বলেন, গ্রামে বিদ্যুতের আলো এনে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও লোভনীয় আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী দালাল ও প্রতারক চক্র তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই দালাল চক্রটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে কলোনীবাসীদের কাছ থেকে এই বিপুল অংকের অবৈধ অর্থ সাবাড় করলেও, দীর্ঘদিন পার হয়ে যাওয়ার পরও তারা কোনো খুঁটি বা তারের সংযোগ এনে দেয়নি। বর্তমানে টাকা ফেরত চাওয়া বা বিদ্যুতের কথা জিজ্ঞাসা করলে ওই দালাল চক্রটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে নানামুখী ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করছে বলে তারা জানান।
ভুক্তভোগী পরিবারের নারীরা চোখের জল মুছে জানান, ঘরে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের বেলা কেরোসিনের কুপি কিংবা সামান্য চার্জার লাইটের আলোতে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, তীব্র গরমে এক ফোঁটা ঠান্ডা বাতাস পাওয়ার জন্য ফ্যান চালানো কিংবা দৈনন্দিন সাধারণ গৃহস্থালি কাজ সম্পন্ন করার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের চরম ও অন্তহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মে মাসের এই প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম ও তাপদাহে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠায় কলোনীর কোমলমতি শিশু ও অশীতিপর বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি পুড়ছেন এবং প্রতিনিয়ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
মধ্যলোন্দা গ্রামের এই অসহায় ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষরা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা অবিলম্বে দালাল চক্রের খপ্পর থেকে এই প্রকল্পটিকে মুক্ত করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের বসতবাড়িতে সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে সরকার ঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়নের সুফল ভোগ করে তারা স্বাধীন দেশের প্রকৃত নাগরিক হিসেবে একটু শান্তিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পেতে পারেন। ছবি সংগৃহীত।

