বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রেকর্ডভুক্ত ও ভোগদখলীয় জমি জোরপূর্বক দখল করে রাস্তা নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) স্থানীয় নেতা নুরুজ্জামান কাফির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, সরকারি এই জমিতে অবৈধভাবে রাস্তা নির্মাণে বাধা প্রদান করায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিমকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। প্রায় এক সপ্তাহ আগে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুজ্জামান কাফি তাঁর ক্রয়কৃত জমিতে প্রবেশের জন্য সিক্সলেন সড়কের উত্তর পাশের ৬ শতাংশ জমির ওপর এই যাতায়াত পথটি নির্মাণ করেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নথিপত্র ও ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে রজপাড়া মৌজার খঞ্জন আলী হাওলাদারের কাছ থেকে ৩ একর ৩৩ শতাংশ, ১৯৫৯ সালে মোবারক আলীর কাছ থেকে ৩ একর ৩৩ শতাংশ, ১৯৬৭ সালে এডিএফসি ব্যাংকের নিলাম থেকে ২৯ একর ১৮ শতাংশ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য মালিকদের কাছ থেকে আরও ৪ একর ৮০ শতাংশ জমি ক্রয় করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বমোট ৪০ একর ৬৪ শতাংশ জমির মধ্যে রজপাড়া মৌজার জেএল নং-৯ এর বিএস ১২ নং খতিয়ানের ২১ একর ৭৬ শতাংশ জমির খাজনা বঙ্গাব্দ ১৪৩২ সাল (২০২৫ খ্রি.) পর্যন্ত পরিশোধ করা রয়েছে। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের পর সরকারি বিধি অনুযায়ী এই বিশাল সম্পত্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের নামে স্থায়ী দলিল করে দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম অভিযোগ করে বলেন, “বিগত এক সপ্তাহ আগে রাতের আঁধারে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এনসিপি নেতা নুরুজ্জামান কাফি বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন জমি থেকে আনুমানিক ৬ শতাংশ জায়গা জোরপূর্বক দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেন। আমরা সরকারি জমি রক্ষার্থে রাস্তা নির্মাণে বাধা দিলে তিনি উল্টো আমাদের জীবননাশের হুমকি প্রদান করেন। আমরা এই মূল্যবান জমি পুনরুদ্ধার ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের দ্রুত ও চাক্ষুষ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন অভিযুক্ত নুরুজ্জামান কাফি। তিনি বলেন, “সবাই জানে জমিটি বিদ্যালয়ের ভোগদখলে আছে। এই জমির পেছনে আমার কেনা নিজস্ব জমি থাকলেও সেখানে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। আমি প্রথমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রহিম স্যারের কাছে জমিটি ক্রয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি জানান যে, এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের নামে থাকায় জমি দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর নেই। পরবর্তীতে আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, মোবারক পঞ্চায়েতের নাতি সালাউদ্দিন নয়ন পাহলানসহ অন্যান্য ওয়ারিশগণ দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে উচ্চ আদালত থেকে ওই জমির পক্ষে চূড়ান্ত রায় পেয়েছেন। এরপর আমি জমির প্রকৃত ওয়ারিশদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ জমি বায়না চুক্তির মাধ্যমে খরিদ করি এবং তাঁরাই আমাকে দখল বুঝিয়ে দেন। আমি কোনো প্রভাবশালী ভূমিদস্যু নই যে অন্যের জমি দখল করব। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।”
জমির মালিকানার বিষয়ে সালাউদ্দিন নয়ন পাহলানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আদালতের রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমার দাদা মোবারক পঞ্চায়েতের ২৯ একর জমি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আদালতে দেওয়ানি মামলা চলছিল। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত কোনো প্রমাণপত্র বা আইনি দলিল আদালতে দাখিল করতে না পারায় পটুয়াখালী জেলা আদালত এবং পরবর্তীতে ঢাকা সুপ্রিম কোর্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন মাসে আমাদের পক্ষে চূড়ান্ত রায় ডিক্রি ঘোষণা করেন। রায় অনুযায়ী আমরাই এই জমির প্রকৃত মালিক এবং আমাদের ভোগদখলে থাকা জমি থেকেই নুরুজ্জামান কাফিকে চলাচলের জন্য ৬ শতাংশ জমি বায়না করে বুঝিয়ে দিয়েছি। ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এখানে বাধা দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।”
ছবি-বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু।


