সংঘাতের মূল রহস্য কী ?

সংঘাতের মূল রহস্য কী ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) :

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার প্রান্তিক জনপদে মাদকের মরণনেশা ও অবৈধ কারবারের প্রকাশ্য বিস্তার সম্পূর্ণ নির্মূল করার সামাজিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দুটি বিবদমান পক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং মারাত্মক ও স্পর্শকাতর অপরাধের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জয়দিয়া গ্রামে মাদক সিন্ডিকেটের দাপট এবং এর বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রামবাসীদের তীব্র প্রতিবাদের জেরে এই প্রকাশ্য সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। গত ২২ মে সকাল ও দুপুরের দিকে দুই দফায় ঘটা এই বর্বরোচিত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই সংঘাতের পর থেকে পুরো জয়দিয়া গ্রাম জুড়ে চরম থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র সামাজিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও নতুন কোনো সহিংসতা এড়াতে এলাকায় বিশেষ পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

স্থানীয় বিশ্বস্ত সামাজিক সূত্র ও ঘটনার বিবরণী থেকে জানা গেছে, কোটচাঁদপুর উপজেলার জয়দিয়া গ্রামের বাসিন্দা পিয়াস ও তার পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক এনে এলাকায় একটি শক্তিশালী অবৈধ কারবার ও সিন্ডিকেট গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ তুলে আসছিলেন এলাকার একদল সচেতন যুবক ও বাসিন্দা। অভিযোগ রয়েছে, যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এলাকার সাধারণ মানুষ এই সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ শুরু করলে পিয়াস ও তার সহযোগীদের সাথে স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবাদী যুবকের তীব্র বিরোধ ও চরম শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ মে সকালের দিকে স্থানীয় সচেতন যুবক মেহেদী ও তার বন্ধুদের সাথে পিয়াসের প্রকাশ্য রাস্তায় তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত জখম হন। এই ঘটনার রেশ ধরে একই দিন দুপুরে দ্বিতীয় দফায় আবারও পুরো গ্রাম জুড়ে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

রক্তক্ষয়ী এই সংঘর্ষের পর পরই পিয়াসের মা নাজমিরা বেগম প্রশাসনের কাছে পাল্টা ও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনে দাবি করেন যে, প্রতিবাদের নামে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক দুপুরের দিকে তাঁদের বাড়িতে অনাধিকার প্রবেশ করে তাঁদের বসতঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে এবং হামলাকারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর শ্লীলতাহানি ঘটিয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় সচেতন গ্রামবাসীদের বড় একটি অংশের দাবি, নিজেদের মাদকের ব্যবসা আড়াল করতে এবং পুলিশি গ্রেফতার থেকে বাঁচতে চতুর মাদক কারবারিরা নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে নিরীহ প্রতিবাদী যুবকদের নামে মামলা দিয়ে হয়রানির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

জয়দিয়া গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম এই সামাজিক সংকটের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকের যে রমরমা ব্যবসা চলছিল, তার বিরুদ্ধে যুবসমাজ বুক চিতিয়ে প্রতিবাদ করায় আমাদের বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের ভয়ভীতি ও হুমকি দেখানো হচ্ছিল। আর এখন আমরা অপরাধের প্রতিবাদ করায় উল্টো আমাদেরকেই ফাঁসাতে নারীদের শ্লীলতাহানির মতো জঘন্য মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এই দালাল ও কারবারিদের হাত থেকে বাঁচতে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।” তবে সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করে নুর আলম নামের অপর এক পক্ষ বলেন, “আমাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত করে একদল সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে নৃশংস হামলা চালিয়েছে। আমরা এই ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তদন্ত গণমাধ্যমকর্মীদের আইনগত অগ্রগতির বিষয়ে আশ্বস্ত করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, জয়দিয়া গ্রামের এই সংঘর্ষ ও আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় উভয় পক্ষের পক্ষ থেকেই থানা দপ্তরে পৃথক দুটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে। পুলিশ কোনো মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে কাউকেই হয়রানি করবে না। ঘটনার আসল সত্যতা, মাদক কারবারের সত্যতা এবং শ্লীলতাহানির দাবির স্পর্শকাতরতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে থানা পুলিশের বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট আইনি ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং এই সামাজিক অস্থিরতা দূর করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে জোর দাবি জানিয়েছেন জয়দিয়া গ্রামের সর্বস্তরের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ। ফাইল ছবি।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *