স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুরুতর আহত জামির বিশ্বাস (৫৫) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ তাণ্ডব ও প্রতিপক্ষের গ্রামে নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে। নিহত জামিরের মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় পৌঁছামাত্রই রোববার রাতে উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ জনতা দলবেঁধে কসবামাজাইল ইউনিয়নের দড়িবাংলাট ও বড় বাংলাট গ্রামে অতর্কিত এই হামলা চালায়। এ সময় অন্তত ১০০টি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর, নির্বিচার লুটপাট এবং কয়েকটি বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
হামলার খবর পেয়ে পাংশা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহত জামির বিশ্বাস উপজেলার পাট্টা ইউনিয়নের ঢেঁপা-মাজাইল গ্রামের হোসেন আলী বিশ্বাসের ছেলে। এই সংঘর্ষের ঘটনায় জামিরের আরও দুই ভাই আমিন বিশ্বাস ও তফাই বিশ্বাস গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পাংশার দড়িবাংলাট গ্রামের বাসিন্দা আকতার হোসেনের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে আব্দুল হাকিমের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার এর জেরে দুপক্ষের মধ্যে প্রথম দফায় মারামারি হয়। পরবর্তীতে বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে গত রোববার জমি মাপার দিন নির্ধারিত হয়। ভাগনে আকতারের আমন্ত্রণে সেখানে সালিশি ব্যক্তিত্ব হিসেবে যান তাঁর মামা জামির বিশ্বাস, আমিন বিশ্বাস ও তফাই বিশ্বাস। জমি মাপার একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং তা মুহূর্তেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রতিপক্ষের লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে তিন ভাই গুরুতর আহত হন। তাঁদের প্রথমে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমিন ও জামিরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরবর্তীতে জামির বিশ্বাসের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাত ৯টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জামির বিশ্বাসের মৃত্যুর খবর কুমার নদীর ওপারে পাট্টা ইউনিয়নের ঢেঁপা-মাজাইল গ্রামে পৌঁছামাত্রই শত শত মানুষ লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দলবেঁধে কসবামাজাইল ইউনিয়নের দড়িবাংলাট ও বড় বাংলাট গ্রামে হানা দেয়। রোববার রাত ১০টার পর শুরু হওয়া এই তাণ্ডবে দড়িবাংলাট গ্রামের অন্তত একশত বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় হামলাকারীরা বড় বাংলাট গ্রামের সালাউদ্দিন ও খায়রুলের পাকা বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে তাদের পেঁয়াজের ঘরসহ কয়েক লাখ টাকার মালামাল ভস্মীভূত হয় এবং গোয়াল ঘর থেকে গরু-ছাগল লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা গতকাল সোমবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শত শত মানুষ এসে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। আমরা ফায়ার সার্ভিসে খবর দিলেও হামলাকারীরা তাদের পথ আটকে দেয় এবং ঘটনাস্থলে আসতে বাধা দেয়।
পাংশা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের লিডার মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “রাত দেড়টার দিকে আমরা অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু পথিমধ্যে উত্তেজিত জনতার তীব্র বাধার মুখে পড়ি। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ও সহিংস ছিল যে ফায়ারের কর্মীরা নিজেরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি।”
এদিকে নিহত জামির বিশ্বাসের ভাতিজা আজমল ও আকুল বিশ্বাসের দাবি, তাঁরা চাচাদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাতে কারা এই হামলা বা অগ্নিসংযোগ করেছে, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না। অন্য কেউ পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটিয়ে তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে বলে তাদের ধারণা। পাট্টা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আকিদুল ইসলাম এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
পাংশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মঈনুল ইসলাম গতকাল সোমবার রাতে জানান, “জামির বিশ্বাসের মৃত্যুর পর তাঁর পক্ষের লোকজন বেশ কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। নিহতের ময়নাতদন্ত ঢাকায় সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।” ছবি সংগৃহীত।

