মো: মাসুদ রানা, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের আলোচিত মুকুল মালিক হত্যা মামলায় দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর পর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। বিজ্ঞ আদালত এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে নিহতের স্ত্রীসহ ৩ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে মামলার অন্য দুই আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মামলা থেকে সসম্মানে খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবনের পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা নগদ জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত দায়রা জজ ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক গৌতম কুমার ঘোষ জনাকীর্ণ আদালতে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের দেওয়া রায় অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত ছহিরুদ্দিনের মেয়ে এবং চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাওকি গ্রামের নিহত মুকুল মল্লিকের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন, একই উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের মিঠু মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন এবং মনোয়ার হোসেনের ছেলে আলমগীর হোসেন। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে আলমগীর হোসেন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অপরদিকে, মামলার দীর্ঘ শুনানিতে অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত মামলার অপর দুই আসামি ফারুক হোসেন ও মাসুদ রানাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন।
মামলার এজাহার ও আদালতের নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, বিগত ২০১৭ সালের ৩ আগস্ট রাতে পারিবারিক বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতক স্ত্রী ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে স্বামী মুকুল মালিকের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও বিরোধ সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধের জের ধরে ওই রাতেই মুকুল মালিক তাঁর নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। স্বজনেরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের ১০ দিন পর, অর্থাৎ ১৩ আগস্ট স্থানীয় গোপীনাথপুর গ্রামের বাঘমারা মাঠের একটি গভীর ধানক্ষেতের ভেতরের গর্ত থেকে সম্পূর্ণ মাটিচাপা ও অর্ধগলিত অবস্থায় মুকুল মালিকের বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের বাবা আব্দুর রশিদ বিশ্বাস বাদী হয়ে হরিণাকুণ্ডু থানায় একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে পুলিশ তদন্ত শেষে স্ত্রী ফিরোজাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ তদন্ত, একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে বিজ্ঞ আদালত আজ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করলেন।
রায়ে আদালত বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ইতিপূর্বে গ্রেফতার হয়ে যে কয়দিন হাজতবাস বা জেল খেটেছেন, সেই সময়টুকু তাদের মূল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ থেকে নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে। দীর্ঘদিন পর এই নৃশংস খুনের বিচার হওয়ায় ঝিনাইদহ আদালত চত্বরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও সাধারণ আইনজীবিরা। ছবি সংগৃহীত।

