কুয়াকাটায় ঈদের ছুটিতেও পর্যটকের খরা

কুয়াকাটায় ঈদের ছুটিতেও পর্যটকের খরা

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:

পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় লাখো পর্যটকের সমাগমের যে আশা করেছিলেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা, তা যেন গুড়ে বালি। ঈদের মোক্ষম মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে লোকসান কাটিয়ে উঠতে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, রাখাইন মার্কেট ও বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ঈদের দ্বিতীয় দিনেও প্রত্যাশিত পর্যটকের দেখা মেলেনি। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের ব্যবসায়িক ধাক্কা খেয়ে পুরো কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পে চরম হতাশা ও নীরবতা নেমে এসেছে।

শুক্রবার (২৯ মে, ২০২৬) সরেজমিনে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের ঈদের ছুটির তুলনায় এবার সৈকতে পর্যটকের উপস্থিতি একেবারেই হাতেগোনা। কুয়াকাটার চিরচেনা জিরো পয়েন্ট, দৃষ্টিনন্দন ঝাউবন এলাকা, গঙ্গামতির চর কিংবা সৈকতের ছাতা-বেঞ্চ জোনে ঈদের সময়ের সেই চেনা উৎসবমুখর আমেজ ও উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়েনি। সৈকতে যেটুকু সমাগম দেখা গেছে, তার সিংহভাগ দর্শনার্থীই ছিলেন পটুয়াখালী ও এর আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা স্থানীয় ভ্রমণপিপাসু মানুষ। তাঁরা কেবল দিনের বেলায় এসে সৈকত ঘুরে সন্ধ্যার আগেই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে আবাসিক হোটেলগুলোতে রাতযাপনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা দূরপাল্লার পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য।

পর্যটকের এই তীব্র স্বল্পতার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সৈকতকেন্দ্রিক খাবার হোটেল, ঝিনুক ও শুঁটকি ব্যবসায়ী এবং রাখাইন মার্কেটসহ পর্যটননির্ভর কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। দোকানে ক্রেতা বা বেচাকেনা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ীকেই অলস সময় পার করতে দেখা গেছে। কুয়াকাটার প্রবীণ পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের বর্তমান সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ তাঁদের বিনোদন ও ভ্রমণ বাজেট অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছেন। আর এই কারণেই দীর্ঘ সরকারি ছুটি থাকা সত্ত্বেও কুয়াকাটায় এবার প্রত্যাশিত পর্যটকদের ঢল নামেনি।

কুয়াকাটার স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী রিপন সাব্বির তাঁর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “অন্যান্য বছর ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটার কোনো হোটেলে রুম খালি পাওয়া যেত না, বুকিংয়ের জন্য হাহাকার পড়ে যেত। কিন্তু এবার এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরিই হয়নি। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না, হয়তো আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে পর্যটকদের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।”

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইব্রাহিম ওয়াহিদ জানান, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা ও স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার শেষ ভরসা হিসেবে সবাই এই কোরবানি ঈদের ছুটিকে ঘিরে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সিংহভাগ হোটেলের রুম বুকিং আশানুরূপ না হওয়ায় কর্মচারী ও স্টাফদের বেতন-ভাতা জোগানো নিয়েই সংশয় তৈরি হচ্ছে।

একই সুর শোনা গেছে কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মোতালেব শরীফের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “কুয়াকাটার ছোট-বড় প্রায় দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস পর্যটকদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিন্তু পর্যটকের উপস্থিতি আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম। তারপরও আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাবাদী যে, ছুটির শেষ দিকে হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।”

এদিকে সৈকতে পর্যটক কম থাকলেও আগত দর্শনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতে কোনো কমতি রাখেনি প্রশাসন। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে সৈকত ও এর আশপাশের দর্শনীয় এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কুয়াকাটা পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের জন্য সৈকত এলাকা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ঈদের মূল মৌসুমেও কুয়াকাটা সৈকতের এমন ফাঁকা ও মলিন রূপ এই খাতের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজারো মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার দীর্ঘ রেখা টেনে দিয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *