স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের শহরতলীর পুলেরহাটে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘আদ্-দ্বীন সখিনা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’-এ ভুল চিকিৎসা, ভুল ইনজেকশন প্রয়োগ ও অবহেলার কারণে ইমরান হোসেন (২৫) নামে এক তরুণ মাছ ব্যবসায়ীর মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) রাত ১১টার পর এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর পরই উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও প্রশাসনিক ব্লকে ভাঙচুর এবং তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একপর্যায়ে নিহতের মা ক্ষোভে ফেটে পড়ে হাসপাতালের প্রধান ফটক লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের একাধিক আভিযানিক দল মধ্যরাত থেকে আজ শুক্রবার ভোর পর্যন্ত হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান নেয়। নিহত ইমরান হোসেন যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গাজীপাড়া গ্রামের শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে।
নিহতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়েরকৃত লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে সামান্য জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে ইমরানকে চিকিৎসার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে ডিউটি অফিসাররা কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা দিলেও, সেই রিপোর্টের অপেক্ষা না করেই ক্যানুলার মাধ্যমে একের পর এক উচ্চমাত্রার ইনজেকশন স্যালাইনের সাথে পুশ করতে থাকেন।
নিহতের খালাতো ভাই ও প্রত্যক্ষদর্শী ইসমাইল হোসেন জানান, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার সাথে সাথেই ইমরান তীব্র বুক ব্যথায় ছটফট করতে থাকেন এবং চিকিৎসাকর্মীদের অনুরোধ করেন পরবর্তী ইনজেকশন না দিতে। কিন্তু সেবিকারা জোরপূর্বক দ্বিতীয় ইনজেকশন দিলে ইমরানের মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হতে শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পর তৃতীয় ইনজেকশন পুশ করতেই ইমরান বেডের ওপর অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রস্রাব করে দেন এবং নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
স্বজনদের দাবি, ইমরান বেডেই মারা গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের গাফিলতি আড়াল করতে রাত ১০টার দিকে তড়িঘড়ি করে তাকে লাইফ সাপোর্টের নামে আইসিইউতে (ICU) নিয়ে যায়। রাত ১১টার পর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হলে হাসপাতাল চত্বরে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ শত শত গ্রামবাসী ও স্বজনরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে চিকিৎসকদের অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এ সময় নিহতের মা ও নারী স্বজনরা জুতা উঁচিয়ে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষের সামনে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তোপের মুখে পড়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন হিমশিম খেয়ে যান এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকরা পেছনের দরজা দিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাত ১টার দিকে কোতোয়ালি থানার এসআই জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছায়। স্বজনরা অভিযুক্ত চিকিৎসককে ৩০ মিনিটের মধ্যে হাজির করার আল্টিমেটাম দিলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা করতে ব্যর্থ হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় এবং নিহতের পরিবার থানায় একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত ইমরান পেশায় একজন সফল মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাঁর ১৭ মাস বয়সী এলহাম নামে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মা, স্ত্রী ও স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে পুরো হাসপাতাল এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আদ্-দ্বীন সখিনা হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন বলেন, “আমাদের চিকিৎসকদের কোনো ভুল ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী ইমার্জেন্সিতে রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।” তবে রিপোর্টের আগেই কেন হাই-ডোজ ইনজেকশন দেওয়া হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান আজ শুক্রবার দুপুরে জানান, “হাসপাতালের পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিহতের বাবার লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তদন্তের পরই ভুল চিকিৎসার বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। দোষীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।” ছবি সংগৃহীত।

