বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
বাড়ি থেকে স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রতিদিনের মতো গত ৩০ জুন সকালে স্থানীয় কোচিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল ১৪ বছর বয়সী কিশোরী মরিয়ম। কথা ছিল, প্রাইভেট শেষ করে সরাসরি মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানে অংশ নেবে এবং বিকেল চারটার মধ্যে ঘরে ফিরবে। কিন্তু দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১২টি দিন পেরিয়ে গেলেও আর ঘরে ফেরেনি মরিয়ম। আদরের ছোট মেয়েকে হারিয়ে এক চরম অসহায়ত্ব ও বুকফাটা নীরব কান্না বিরাজ করছে ওই পরিবারে।
নিখোঁজ মরিয়ম মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং মহিপুর থানার সদর ইউনিয়নের নজিবপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর শিকদারের কন্যা।
পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদুরে কন্যার এমন আকস্মিক নিখোঁজ ও দুশ্চিন্তায় পাগলপ্রায় তার মা পারুল বেগম। শান্ত স্বভাবের ও আল্লাহভীরু মরিয়মের খোঁজে স্বজনরা দিন-রাত হন্যে হয়ে সহপাঠী, বন্ধু ও পরিচিতজনদের বাড়িতে চষে বেড়াচ্ছেন। মরিয়মের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে মহিপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে প্রায় দুই সপ্তাহ পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস মেলেনি।
নিখোঁজ শিক্ষার্থীর বোন জামাতা নাঈম গণমাধ্যমকর্মীদের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, নিখোঁজের দিন মরিয়মকে একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। সেখানে দেখা যায়, মরিয়ম বারবার আতঙ্কের সাথে পিছনের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে এবং বেশ জোরে জোরে হাঁটছে। ফুটেজ দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ হয়তো তাকে তাড়া করছে বা সে কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তিনি আরও জানান, মরিয়মের কোথাও কোনো প্রেমের সম্পর্ক আছে কিনা বা কোনো ছেলের সাথে তার ওঠাবসা ছিল কিনা—সে বিষয়ে বান্ধবীদের সাথে কথা বলে ও সর্বাত্মক খোঁজ নিয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, মরিয়ম অত্যন্ত শালীন জীবনযাপন করত।
মরিয়মের মা পারুল বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়ে সব সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করত এবং সব সময় বোরকা পরিধান করেই বাইরে বের হতো। কোনোদিন কোনো উশৃঙ্খলতা আমরা ওর মধ্যে দেখিনি। মরিয়ম কখনো এক মুহূর্তের জন্য ঘরের বাইরে থাকতে পারে না। আজ ১২ দিন ও কোথায় আছে, কীভাবে আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা—তা নিয়েই এখন আমরা চরম সংশয়ে আছি।”
কান্নায় ভেঙে পড়ে মরিয়মের বাবা জাহাঙ্গীর শিকদার জানান, মরিয়মের বয়স প্রায় ১৪ বছর হয়েছে। কিন্তু এই বয়সের মধ্যে সে কোনোদিন একা ফোনের ওপারে কারও সাথে এক মিনিটও কথা বলেনি। কোনোদিন এক রাতের জন্যও সে পরিবারের বাইরে থাকেনি। আজ আমার আদরের মেয়েটি নিখোঁজ, ও বেঁচে আছে তো?—এই কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় মূর্ছা যান।
এদিকে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর এমন রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বাণী কান্ত শিকদার। তিনি বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে আমরা শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষার্থীরা খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ, এর আগেও এই বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ছেলেধরার কবলে পড়েছিল। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মরিয়মের সন্ধান পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিবার থেকে জিডি করা হয়েছে এবং আমরাও বিভিন্ন মাধ্যমে আইনি সহযোগিতা নিচ্ছি।”
এ বিষয়ে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামিম হাওলাদার বলেন, “শিক্ষার্থী মরিয়মের নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার থেকে একটি জিডি করা হয়েছে। আমাদের পুলিশের বিশেষ টিম মরিয়মের অবস্থান শনাক্ত ও তাকে নিরাপদে উদ্ধারের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিরলস কাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে তাকে দ্রুত উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।” ছবি সংগৃহীত।

