স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর শহরতলীর অন্যতম প্রবেশদ্বার এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত যশোর সদর উপজেলার ৪নং নওয়াপাড়া ইউনিয়ন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জনপদে বইতে শুরু করেছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। প্রতীকবিহীন এবারের ব্যতিক্রমী নির্বাচনে ব্যক্তিগত ইমেজ আর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে পুঁজি করে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে নওয়াপাড়ার মাঠে জোরেশোরে নেমেছেন যশোর সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। পেশাগত জীবনে যশোর পৌরসভার সাবেক কর নির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এখন নওয়াপাড়ার আপামর মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান। তার পরিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্মের পর থেকেই এই ঘরানার রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, তিনি বৃহত্তর যশোর জেলা বিএনপির এক সময়ের প্রভাবশালী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা মরহুম আবদার ফারুকের ছোট ভাই, যিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তৎকালীন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও তার পরিবারকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক একটি হত্যা মামলা, দুটি নাশকতার মামলা এবং একটি চাঁদাবাজির মামলাসহ মোট পাঁচটি রাজনৈতিক মামলার শিকার হন তিনি। শুধু মামলাতেই শেষ নয়, বিভিন্ন মেয়াদে দুইবার তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে এবং ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয়টি বছর নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে ফেরারি জীবন কাটাতে হয়েছে। এই রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবারটি তাদের জীবনের অনেক মূল্যবান সময় ও সম্পদ হারিয়েছে। শুধু আলাউদ্দিন নিজেই নন, তার পুরো পরিবারই দলের জন্য নিবেদিত। তার বোন সুফিয়া মাহমুদ রেখা বর্তমানে ইউনিয়ন বিএনপির মহিলা দলের সভাপতি হিসেবে মাঠ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব সংগঠিত করছেন এবং তার ভাইপো অর্থাৎ শহীদ আবদার ফারুকের ছেলে আকরাম হোসেন ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তরুণ সমাজকে উজ্জীবিত রাখছেন।
এলাকাবাসী এবং সাধারণ ভোটারদের মাঝে মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের একটি ক্লিন ইমেজ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে। বিপদে-আপদে তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং এলাকার সামাজিক ও উন্নয়নমূলক নানা কর্মকাণ্ডে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে তার একটি বড় শক্তির জায়গা হলো, তিনি দাবি করেন এই ইউনিয়নে তার ব্যক্তিগত প্রায় ২০ শতাংশ নিশ্চিত ভোট ব্যাংক রয়েছে, যা যেকোনো নির্বাচনে জয়ের জন্য বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারের বেশি, যার মধ্যে আওয়ামী ঘরানার ভোটার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের জোরালো দাবি, দলের দুর্দিনের এই ত্যাগী নেতাকেই যেন আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের ধারক-বাহক হিসেবে বা দলের একক প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দলের ভেতর থেকেই মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মী অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তারা বিপদে পড়ার পর আলাউদ্দিনকে পাশে পাননি। অবশ্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নিয়ে এই অভিযোগের কোনো সত্যতা বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে, দল যদি তার দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়ন করে তাকে মনোনয়ন প্রদান করে, তবে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নটি দলকে উপহার দিতে পারবেন। তবে দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন যে, দল যদি কোনো কারণে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নেয়, তবে তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না এবং মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করবেন।
এদিকে নওয়াপাড়ার এই মনোনয়ন যুদ্ধ মোটেও সহজ হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ দলটিতে মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের পাশাপাশি আরও দুই থেকে তিনজন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, যারাও বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত এবং মাঠে সক্রিয় আছেন। তার ওপর এবারের নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকছে না, ফলে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সততা এবং সামাজিক পরিচিতিই ভোটারদের আকৃষ্ট করার মূল হাতিয়ার হবে। শহরতলীর এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নে শেষ পর্যন্ত বিএনপি কাকে তাদের আস্থাভাজন হিসেবে বেছে নেয় এবং ভোটারদের মন জয় করে কে নওয়াপাড়ার মসনদে বসেন, তা দেখার জন্য পুরো যশোরবাসী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ছবি সংগৃহীত।

