স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর নতুন উপশহর হাউজিং এস্টেট কি কোনো সরকারি দপ্তর, নাকি নির্দিষ্ট একজন কর্মকর্তার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পারিবারিক খনি? এই প্রশ্নটি এখন উপশহরের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) ইমাদুল ইসলাম তুহিন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে তিনি এই দপ্তরে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে প্রথম যোগ দেন। এরপর ২০১৮ সালে বাগিয়ে নেন প্রশাসনিক কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব। ২০২২ সালে সুনির্দিষ্ট অনিয়মের কারণে তাঁকে বগুড়ায় বদলি করা হলেও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ২০২৩ সালে তিনি আবারও যশোরে ফিরে আসেন। সচেতন মহলের প্রশ্ন, বারবার এই যশোর হাউজিংয়েই কেন তাঁকে ফিরে আসতে হবে, কী মধু লুকিয়ে আছে এখানে? দীর্ঘ সময় ধরে একই এলাকায় জেঁকে বসার সুবাদে স্থানীয় এক শ্রেণির চিহ্নিত ও প্রভাবশালী দালাল চক্রকে হাতে রেখে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যাদের সহযোগিতায় প্রতিনিয়ত চলছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য এবং দুর্নীতি।
অভিযোগ উঠেছে, এই ইমাদুল ইসলাম তুহিন সাধারণ মানুষকে স্থায়ী দলিল করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কয়েক দফায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কাজ না করে উল্টো আরও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই শুরু হয় তাঁর আসল খেলা, যার নির্মম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি উপশহরে চালানো এক উচ্ছেদ অভিযানে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক উচ্ছেদ ছিল না, বরং চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিতে ব্যর্থ হওয়া পরিবারগুলোর ওপর চালানো হয়েছে পরিকল্পিত প্রতিশোধ। পুতুল নামে এক ভুক্তভোগী নারী স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন, তাঁর কাছ থেকে তুহিন প্রথমে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দেওয়ায় উচ্ছেদের নামে তাঁর বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে মাহফুজ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২২ লাখ টাকা এবং ঝন্টু নামে আরেক বাসিন্দার কাছ থেকে এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর সব দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ঝন্টু জানান, আমার কাছ থেকে এক লাখ সহ ২৭ টি পরিবারের কাছ থেকে ১লাখ করে মোট ২৭ লাখ টাকা উনি আদায় করেছেন। উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অবৈধ উপায়ে কামানো এই কোটি কোটি টাকা আড়াল করতে ইমাদুল ইসলাম তুহিন চরম চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। যশোর উপশহরের একাধিক মূল্যবান প্লট তিনি নিজের নামে না কিনে, তাঁর নিকটাত্মীয় এবং সজনদের নামে বেনামে ক্রয় করেছেন। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত এই বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় এখন উপশহরের প্রকাশ্য বাস্তবতা। অথচ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান দাবি করেছেন যে, এই উচ্ছেদ অভিযানে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি এবং সব নিয়ম মেনেই অভিযান চালানো হয়েছে। যদিও উচ্ছেদ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বর্তমানে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার খুঁটির জোর এতই শক্ত যে, সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেলেই তিনি পেছনের দরজা দিয়ে অফিস থেকে পালিয়ে যান এবং কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য দিতে রাজী হন না। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন লাগামহীন দুর্নীতি, স্থানীয় চিহ্নিত অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে কোটি কোটি টাকার বেনামী প্লট কেনার এই মহা-উৎসব এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জন্য একটি বড় পরীক্ষা। ভুক্তভোগী ও যশোরবাসীর দাবি, ইমাদুল ইসলাম তুহিনের এই ‘মধু’র খনির উৎস সন্ধানে এবং তাঁর আত্মীয়দের নামে থাকা প্লটগুলোর প্রকৃত মালিকানা উদঘাটনে দুদক অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করুক, যাতে এই দীর্ঘমেয়াদী সিন্ডিকেটের হাত থেকে উপশহরের সাধারণ মানুষ মুক্তি পায়।ফাইল ছবি সংগৃহীত।


