স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের এক চরম অমানবিক, জঘন্য ও ধৃষ্টতাপূর্ণ রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক নিষ্পাপ ৭ বছরের শিশু কন্যার মরদেহ তার শোকাতুর বাবা-মা নিজেদের পারিবারিক গাড়িতে করে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় জোরপূর্বক পথরোধ করেছে অ্যাম্বুলেন্সের কতিপয় অসাধু চালক ও কর্মী। নিজস্ব বাহন ব্যবহারে বাধা দিয়ে নিজেদের চড়া ভাড়ার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারে বাধ্য করার চেষ্টার অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে হাসপাতাল চত্বর থেকে দুই অ্যাম্বুলেন্সকর্মীকে হাতেনাতে আটক করেছে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ।
হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ঢাকা শহরের বাসাবো এলাকার বাসিন্দা পেশায় রোডমিস্ত্রি আলাউদ্দিনের ফুটফুটে কন্যা আয়াত খাতুন (৭) দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আনা হয়। কিন্তু হাসপাতালে আনার পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. আনসার আলী পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে শিশু আয়াতকে মৃত ঘোষণা করেন।
আয়াতের নানার বাড়ি যশোরের চৌগাছা উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে হওয়ায়, তার বাবা আলাউদ্দিন ও মা সীমা খাতুন সিদ্ধান্ত নেন মেয়ের মরদেহটি দাফনের জন্য নিজেদের একটি চেনা বাহনে করে মির্জাপুরে নিয়ে যাবেন। সেই অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে শিশুটির মরদেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ঠিক সামনের উঠোনে একটি স্ট্রেচারে রাখা হয়েছিল।
সরাসরি অভিযোগ উঠেছে, মরদেহটি গাড়িতে তোলার সময় সেখানে ওত পেতে থাকা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক ও হেলপারদের একটি দল জোটবদ্ধ হয়ে স্বজনদের ওপর চড়াও হয়। তারা জোরপূর্বক নিজস্ব বাহনে লাশ তুলতে বাধা দেয় এবং তাদের চড়া দামের সিন্ডিকেটভুক্ত প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার জন্য মানসিক চাপ ও হুমকি-ধামকি দিতে থাকে। সন্তান হারিয়ে স্তব্ধ মা-বাবার ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন চলতে দেখে হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জেলা গোয়েন্দা শাখা পুলিশের কনস্টেবল সুজন হোসেন এগিয়ে যান এবং বাধা দেওয়ার কারণ জানতে চান।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সিন্ডিকেটের মূল হোতা আবু সায়েদ মিঠু ও কামাল হোসেনসহ অন্য চালকেরা। তারা উল্টো ডিএসবি সদস্য সুজনের সাথে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলে লিপ্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আরও ডজনখানেক অ্যাম্বুলেন্স চালক জড়ো হয়ে হাসপাতাল চত্বরে এক ভীতিকর ও চরম উত্তেজনাপূর্ণ অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
হাসপাতাল চত্বরে পুলিশের সাথে সিন্ডিকেটের ধস্তাধস্তি ও উত্তেজনার খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের একটি বড় স্ট্রাইকিং ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে হানা দেয়। পুলিশি অ্যাকশনের মুখে অন্য চালকেরা গাড়ি ফেলে পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে মূল অবরুদ্ধকারী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দুই অ্যাম্বুলেন্সকর্মী আবু সায়েদ মিঠু ও কামাল হোসেনকে হাতেনাতে আটক করে সরাসরি প্রিজন ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আটককৃত মিঠু ও কামাল উভয়েই যশোর শহরের ঘোপ এলাকার বাসিন্দা বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
যশোরের সচেতন নাগরিক মহল ও ভুক্তভোগী রোগীদের দাবি, ২৫০ শয্যা হাসপাতাল চত্বরে এই প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে রেখেছে। সরকারি ও নিজস্ব গাড়িকে পাত্তাই দেয় না তারা। কোনো অসহায় রোগী কিংবা লাশবাহী গাড়ি আসলেই তারা স্বজনদের জিম্মি করে পকেট কাটে।
গত ১২ মে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত জেলা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সভায় এই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ ও হাসপাতাল চত্বর জঞ্জালমুক্ত করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য খুঁটির জোরে সেই সরকারি সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা হাসপাতাল চত্বরে এই নোংরা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
সর্বশেষ আজকের এই মর্মান্তিক ও স্পর্শকাতর ঘটনায় কোতোয়ালি থানা পুলিশের তাৎক্ষণিক ও জুতসই হস্তক্ষেপ এবং দুই প্রভাবশালী কর্মীকে আটকের ঘটনায় গভীর সন্তোষ ও স্বস্তি প্রকাশ করেছে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ শহরবাসী। ধৃতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

