পল্লী বিদ্যুতে ডিজিএমের চরম স্বেচ্ছাচারিতা!

পল্লী বিদ্যুতে ডিজিএমের চরম স্বেচ্ছাচারিতা!

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু , কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কলাপাড়া জোনাল অফিসের নবনিযুক্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) শেখ আব্দুর রহমানের লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালিপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় গ্রাহকসহ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গ্রাহক পর্যায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, মিটার বন্ধ থাকলেও মাসের শেষে অবাস্তব ভৌতিক ও অতিরিক্ত বিলের বোঝা চাপানো এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোরপূর্বক গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে আটকে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেকোনো মুহূর্তে ভুক্তভোগী উপজেলাবাসী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কর্মকর্তার অপসারণের দাবিতে রাজপথে নামতে পারেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে কলাপাড়া জোনাল অফিসে যোগ দেন নতুন ডিজিএম শেখ আব্দুর রহমান। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কলাপাড়ায় বিদ্যুৎ সেবার চরম অবনতি ঘটে। বিশেষ করে সদ্যসমাপ্ত জুন মাস জুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

এর ওপর যোগ হয়েছে ভৌতিক ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অত্যাচার। মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রাহক সোনিয়া আক্তার অভিযোগ করেন, নতুন ঘরের কাজ চলায় মে মাসে তাঁর পুরো পরিবার অন্যত্রে অবস্থান করায় ঘরের মিটারটি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। অথচ এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ না করলেও অফিস থেকে মোটা অঙ্কের ভৌতিক বিল পাঠানো হয়। পরে অফিসে যাতায়াত করে তা সংশোধন করালেও যাতায়াতের অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ কে দেবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। একইভাবে টিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বর সোবহান বিশ্বাস অভিযোগ করেন, তাঁর দোকানে আগে যেখানে ৫০০-৬০০ টাকা বিল আসত, এখন সেখানে জোরপূর্বক দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বিল পাঠানো হচ্ছে। অফিসে অভিযোগ করতে গেলেও গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

শুধু গ্রাহক হয়রানিই নয়, সরকারি নীতিমালা তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমতো অফিস পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস সময় নির্ধারিত থাকলেও, ডিজিএমের খামখেয়ালিতে প্রতিদিন রাত ১০টা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ কর্মচারী, বিশেষ করে নারী কর্মীরা গভীর রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ও বেকায়দায় পড়ছেন। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস খোলা রেখে পর্দার আড়ালে কোনো অনিয়মের জাল বোনা হচ্ছে কি না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কলাপাড়ায় যোগদানের আগে বরগুনা সদর অফিসে কর্মরত থাকাকালীনও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কর্মচারীরা তাঁর চরম স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন। এমনকি সেখানে অতিরিক্ত খামখেয়ালিপনার কারণে তিনি কর্মচারীদের মারধরের শিকারও হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কলাপাড়ায় এসেও তিনি একই আচরণের পুনরাবৃত্তি করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলাপাড়া অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান, “জুন ক্লোজিং এর আগেও হয়েছে, কিন্তু এমন নিয়মবহির্ভূত রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস করার ঘটনা এর আগে কোনো ডিজিএমের আমলে ঘটেনি। আমরা চাকরির ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে না পারলেও অতি দ্রুত এই স্বেচ্ছাচারী ডিজিএমের বদলি চাই, অন্যথায় আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কলাপাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম শেখ আব্দুর রহমান নিজের গা বাঁচিয়ে জানান, লোকবল কম থাকায় কিছু ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা ভৌতিক বিল হতে পারে, যা অভিযোগ পেলে সংশোধন করা হয়। আর জুন ক্লোজিংয়ের কারণে কর্মচারীরা নিজের ইচ্ছেতেই বেশি সময় কাজ করছেন। তবে রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস খোলা রাখা যে সম্পূর্ণ সরকারি নিয়মের পরিপন্থী—তা তিনি অকপটে স্বীকার করেন।

অন্যদিকে, পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবুল কাশেমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কঠোর বার্তা দিয়ে জানান, “অতিরিক্ত কিংবা ভৌতিক বিলের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে। তাছাড়া, সরকারি নিয়ম ভেঙে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রাখার কোনো নিয়ম পল্লী বিদ্যুতে নেই। কারো কাজ বকেয়া থাকলে তা পরের দিন সম্পন্ন করবে। কলাপাড়া জোনাল অফিসের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুতই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

ছবি-বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *