মো.মাসুদ রানা,ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদাসীনতায় ধ্বংস প্রায় নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্রের ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামের রায়পাড়াস্থ পৈত্রিক ভিটাবাড়ি।
নাচোল বিদ্রোহের অবিসংবাদিত নেতা কমরেড ইলা মিত্র। নাচোল বিদ্রোহ (১৯৪৯-১৯৫০) ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোলে সংঘটিত জমিতে তেভাগা দাবিতে ভূমিহীন ও বর্গাদার কৃষক-মজুরের অধিকার আদায়ে রক্তস্নাত ইতিহাসের অনবদ্য অধ্যায়।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ১৩ কিলোমিটার দুরের গ্রাম বাগুটিয়া। গ্রামের একপ্রান্তে কাঁচা রাস্তার পাশে চুন-সুড়কি দিয়ে গাঁথা ৯ রুমের পুরনো একটি দ্বিতল বাড়ি। এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানেনা বাড়িটির ইতিহাস। শুধু জানেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো ছিল, এখন সেখানে হাজী কিয়াম উদ্দিনের ছেলেরা বসবাস করেন। মূল ঘরটির ৫ টি রুম ব্যবহার করা যায়। পরিবারটি সেগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বাকি রুমগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তারা কীভাবে বাড়িটি ভোগদখল করছেন তা জানেন না এলাকাবাসী। গ্রামের গুটিকয়েক মানুষ কেবল জানেন যে, ‘বাড়িটি কোনো এক বিপ্লবী মানুষের।’ সেই বিপ্লবী মানুষটি হচ্ছেন তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, সংগ্রামী নারী ইলা মিত্র। শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের এই বাড়িটি ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে এই বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকলেও রয়েছে বে-দখল। ভেঙে পড়তে শুরু করেছে ইটের গাঁথনিগুলো। চওড়া দেয়ালে ঘেরা প্রাচীরের অনেক অংশ ভেঙে ফেলেছে দখলদাররা। শুধু বাড়ি নয়, দখল করা হয়েছে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া শত শত বিঘা জমি। সরকারের খাতায় এগুলো ভিপি তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে তা এলাকার প্রভাবশালীদের দখলে।
ইলা মিত্র অবিভক্ত ভারতের কিংবদন্তী বিপ্লবী। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের চাকরীর সুবাদে তাঁর জন্ম কলকাতায়। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। মা মনোরমা সেন গৃহিনী। ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রাম তাদের পৈত্রিক নিবাস। ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় হলেও ছোট বেলায় তিনি বেশ কয়েকবার বাগুটিয়া গ্রামে এসেছেন।
সরেজমিনে ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো আমলের নিদর্শন চুন-সুড়কির তৈরী দ্বিতল বাড়িতে বসবাস করছেন জনৈক হাজী কিয়াম উদ্দিনের সন্তান যথাক্রমে আলী হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ ও রাশিদুল ইসলাম গং। বর্তমান বাসিন্দাদের তৃতীয় প্রজন্ম আবু বকর জানান, ‘তারা বাগুটিয়রা ১১৬ নং মৌজার ২৩৪৫ দাগের জমির উপর বাড়িটি সহ ৮৪ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। মৃত হাজী কিয়াম উদ্দিন বহু পূর্বে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের শ্বাশুড়ি সরোদিনী সেনের কাছ থেকে এই জমি কিনে নেন। সরোদিনি সেন কিভাবে এই জামির মালিক হলেন তা তিনি বলতে পারেন না বলে জানান। তিনি আরো বলেন, এই সম্পত্তির বিনিময়সূত্রে মালিক জনৈক খোদা বক্স -এর নিকট থেকেও বাড়িসহজমাজমি ক্রয়মূলে ভোগদখল করছেন। ১৯৪৭ সাথে দেশবিভাগ হলে ইলা মিত্রের পিতৃকুলের সকলে ভারতে স্থায়ী হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশবিভাগের ঘটনায় ভারতে চলে যাওয়া পরিবারের সম্পত্তিকে শত্রুসম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত হলে ১৯৭০ সালে বাড়িসহ জমাজমির দলিল নিবন্ধন সচেতন ও বিজ্ঞ মহলে নানাবিধ প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ইলা মিত্রের বাড়িতে বসবাস শুরু করা পরিবারটি রাতারাতি বাড়িসহ সমুদয় সম্পত্তির মালিক বনে গেলেন কীভাবে, এ প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। বর্তমানের বাসিন্দাদের দাবি সঠিকমূল্যে অন্যত্র পুনর্বাসন করা হলে তারা বাড়িটি সরকার সমীপে জেলা প্রশাসন বরাবর হস্তান্তরে সম্মত হয়েছেন।
কিংবদন্তী নারী ইলার শৈশব কৈশর সময় পার করা বাগুটিয়া, গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দপুর, শাহাবাজপুর সহ কয়েকটি গ্রামে। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন, মা মনোরমা সেন এবং পিতামহ রাজমোহন সেনের নামে রয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি। এসব ভিপি সম্পত্তি হিসাবে সরকারী খাতায় থাকলেও তার সবটুকুই এখন বে-দখল। তবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান এসব সম্পত্তির ব্যাপারে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি ও দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
ইলা মিত্রের পরিবার সম্পর্কে ওই গ্রামের বাসিন্দা জানান, ‘তারা শুনেছেন নগেন্দ্রনাথ সেন নামে এক ব্যাক্তি তাদের এলাকার ছোট-খাটো জমিদার ছিলেন। বাগুটিয়াসহ পাশ্ববর্তী কয়েকটি মৌজায় বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের অঢেল জমি-জিয়ারত ছিল। যা বর্তমানে এলাকার প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। হাজি কিয়াম উদ্দিন ছাড়াও জনৈক আমিনুল ইসলামের দখলে রয়েছে ওই নগেন্দ্রনাথ সেনের সিংহভাগ জমি। তবে তিনি যে ইলা মিত্রের বাবা ছিলেন এটা তারা জানতেন না। তার দাবি, বাড়িটি যদি ইলা মিত্রের হয় তাহলে এটি সংরক্ষণ করা জরুরী। তার মতে, এটা রক্ষা হলে এক কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রক্ষা হবে। বাগুটিয়া গ্রামের ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ী ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষন করা উচিত।’
কিংবদন্তি ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়িটি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া রায়পাড়ায় বাড়িটি অবস্থিত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত এই বাড়িটি বর্তমানে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে কালের সাক্ষী এ বাড়িটিকে পুরাকীর্তি ও প্রত্মসম্পদ একইসাথে বিপ্লবী ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষিত স্থান ঘোষণা করেছে।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপ-সচিব মোঃ মকবুল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া (রায়পাড়া) গ্রামের ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৬৮ সালের (সংশোধিত ১৯৭৬) পুরাকীর্তি আইনে সংরক্ষণ উপযোগী।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি, মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ, নাচোলের রানিমা খ্যাত ঝিনাইদহের শৈলকুপার ভূমিকন্যা, কমিউনিস্ট পার্টির প্রখ্যাত নেত্রী বিপ্লবী ইলা মিত্রের পৈত্রিক ভিটা অধিগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামে তার পৈত্রিক ভিটা রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রায় একদশক পেরিয়ে গেছে, কালের সাক্ষী ও ঐতিহাসিক স্মৃতিবিড়জিত গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানটি আজও বেদখল থাকায় প্রশাসনিক গাফিলতিকে দায়ী বলে জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
বিগত ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পত্র সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
লেখক ও গবেষক বঙ্গ রাখাল বলেন, ‘সারা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ণের শিকার রাজনীতিবিদ হলেন ইলা মিত্র। কমরেড ইলা মিত্র ভারত ও বাংলাদেশ-উভয় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় স্বীকৃত হয়েছে। উপমহাদেশের মানুষের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারাজীবন লড়াই করলেও আজ নিজের পিতৃভূমি-বাড়িসহ জমাজমি সবটুকুই অরক্ষিত। বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসাবে অবিলম্বে ইলা মিত্রের বাবার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি ঐতিহাসিক প্রয়োজন। যোগ্য দেশপ্রেমিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাঠ দিতে নাচোল বিদ্রোহের রানিমা ইলা মিত্রকে অবশ্যই ধারণ করা জরুরি।’
‘প্রজন্মের চেতনায় দেশপ্রেম ও সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী জাগরণ ঘটাতে ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্র’র পৈত্রিক বাড়ি সংরক্ষণ, নাচোল কৃষক আন্দোলনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশসহ বিচারিক রায়কে অবৈধ ঘোষণা, পাঠ্যপুস্তকে জীবনী সংযোজন, ইলা মিত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সড়ক নামকরণের গণদাবি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে জানিয়েছেন সিপিবি ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবু তোয়াব অপু।’ ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ঘোষণার এক দশক পেরিয়ে গেলেও একটা সাইনবোর্ড-ব্যানার পর্যন্ত দিতে পারেনি। প্রখ্যাত কৃষকনেতা ইলা মিত্রের ভিটামাটি অরক্ষিত থাকাকে প্রশাসনের গাফিলতি বলে উল্লেখ করেন সাংস্কৃতিক সংগঠক বায়েজিদ চাষা।’ এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো: নোমান হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ও ঐতিহাসিক এ বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ছবি সংগৃহীত।


