মোঃ মাসুদ রানা, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি :
বহু শতাব্দী প্রাচীন ভূখণ্ড-ঝিনাইদহের ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে হেরিটেজ স্থাপনা। জেলাজুড়ে ২১টি হেরিটেজ স্থাপনার কথা উল্লেখ থাকলেও সরেজমিনে অধিকসংখ্যক ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়। অসংখ্য পরিমাণে ঝিনাইদহে সুলতানি আমলের মসজিদ, জমিদার বাড়ি, নীলকুঠি, মন্দির,মাজার, কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও স্থাপনা রয়েছে। এসব পুরাকীর্তি, প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ আজও গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রেখেছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত এসব স্থাপনা জেলার ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবে অধিকাংশই সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। গেজেটে তালিকাভুক্ত থাকলেও কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেই। জেলার ছয়টি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অনেকগুলোই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কোথাও দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও ছাদ ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছে, আবার কোথাও দখল, বন-জঙ্গল-আগাছা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারে ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব বহু মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী স্থান ও প্রত্মসম্পদ অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে।
জেলার সবচেয়ে বেশি প্রত্নসম্পদ রয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার এলাকায়। ইতিহাসবিদদের মতে, বারোবাজার একসময় ‘মোহাম্মদাবাদ’ নামে পরিচিত একটি সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্র ছিল। মধ্যযুগে এটি ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত জোরবাংলা মসজিদ, গলাকাটা মসজিদ ও দীঘি, গোড়ার মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, পীরপুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, সাতগাছিয়া মসজিদ, খেরের দীঘি মসজিদ, চেরাগদানি মসজিদ ও দীঘি, সওদাগর দীঘি ও মসজিদ, পাঠাগার মসজিদ এবং জাহাজঘাটা মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যশৈলী ও নগর সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
জোরবাংলা মসজিদ তার ব্যতিক্রমী স্থাপত্যরীতির জন্য পরিচিত। দুই বাংলাঘর আকৃতির ছাদের আদলে নির্মিত হওয়ায় মসজিদটির এমন নামকরণ হয়েছে। গলাকাটা মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও কিংবদন্তি। গোড়ার মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ ও পীরপুকুর মসজিদ সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
শুকুর মল্লিক মসজিদ ও সাতগাছিয়া মসজিদে ব্যবহৃত পোড়ামাটির অলংকরণ এবং কারুকাজ ইতিহাস গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের বিষয়। খেরের দীঘি মসজিদ ও চেরাগদানি মসজিদের পাশের প্রাচীন দীঘিগুলো একসময় স্থানীয় জনপদের পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। সওদাগর দীঘি ও মসজিদ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি বহন করে। অন্যদিকে জাহাজঘাটা ধারণা দেয়, একসময় এ অঞ্চলে নদীপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। জলেরগ্রাম ঝিনাইদহে জলপথে যাতায়াত ও বাণিজ্য প্রচলন ছিল বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
বারোবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা গাজী কালু ও চম্পাবতীর মাজার। বাংলার লোকসাহিত্যে গাজী কালু ও চম্পাবতীর কাহিনি বিশেষভাবে পরিচিত। তাদের স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মাজার এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। একই এলাকার পাঠাগার মসজিদ বা পাঠাগার ঢিবি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান, যেখানে প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্য কেন্দ্রগুলো :
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় অবস্থিত মিয়ার দালান ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক ভবন এটি। একই উপজেলার কালীপদ (কে.পি.) বসুর পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের প্রখ্যাত গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদ কালীপদ বসুর স্মৃতিবিজড়িত। এ বাড়িটি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। লোকসংগীতের কিংবদন্তি সাধক পাগলা কানাইয়ের সমাধি ঝিনাইদহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। বাউল ও লোকসংগীতপ্রেমীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রতি বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের মানুষ এখানে আসেন।
শৈলকুপা উপজেলার শাহী মসজিদ ও হিতামপুর গ্রামের শাহী মসজিদ সুলতানি স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে গম্বুজ,খিলান ও অলংকরণ মধ্যযুগীয় নির্মাণশৈলীর পরিচয় বহন করে। একই উপজেলার রামগোপাল মন্দির হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মন্দিরটির কারুকাজ ও নকশা ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান। শৈলকুপা শহরের অদূরে কুমার নদীর তীরে বিজুলীয়া নীলকুঠির বর্ণনায় ইতিহাসে ৪৮ গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত বিজুলীয়া নীল বিদ্রোহ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কয়েকবছর পূর্বেও স্মৃতি চিহ্ন ছিল। ঐতিহাসিক নাচোল কৃষক বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী কমরেড ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি শৈলকুপার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ স্থাপনা। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ এদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ইলা মিত্রের অবদান স্মরণে এই বাড়িটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইতিহাস সচেতন মানুষের কাছে এটি সংগ্রাম,অধিকার আদায় এবং শোষণবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক।
মহেশপুর উপজেলার খালিশপুর নীলকুঠি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। নীলচাষকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে যে শোষণ ও নিপীড়নের ইতিহাস গড়ে উঠেছিল, তার নীরব সাক্ষী এই নীলকুঠি। ভবনটির প্রতিটি ইট যেন সেই ইতিহাসের কথাই বলে।
অন্যদিকে জেলার ঐতিহাসিক নলডাঙ্গা রাজবাড়ি ও মন্দির কমপ্লেক্স জমিদারি শাসনের স্মৃতি বহন করে। রাজবাড়ির স্থাপত্য,মন্দিরের নকশা এবং বিস্তৃত প্রাঙ্গণ একসময়কার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। এটি জেলার অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়দের মতে, ঝিনাইদহের হেরিটেজ স্থাপনা শুধু জেলার নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, উদাসীনতা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং কিছু ক্ষেত্রে দখলদারিত্বের কারণে অনেক স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি স্থাপনার চারপাশে পর্যাপ্ত সীমানা প্রাচীর নেই। কোথাও স্থানীয়ভাবে কৃষিকাজ হচ্ছে,কোথাও গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ দেখা যায়। আবার কিছু স্থানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রত্মসম্পদের পরিবেশ নষ্ট করছে। অনেক জায়গায় নেই কোনো তথ্যফলক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক হেরিটেজ স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে অবস্থিত। ফলে সংস্কার বা সংরক্ষণে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। আবার কোথাও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে স্থাপনাগুলো সংস্কারের অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় এসব স্থাপনাকে ঘিরে নানা লোককথা,ধর্মীয় অনুষ্ঠান,সামাজিক আয়োজন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানে না।
গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, ঝিনাইদহের হেরিটেজ স্থাপনাগুলো শুধু অতীতের স্মারক নয়; এগুলো জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও সম্ভাবনাময় সম্পদ। সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এসব স্থাপনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন শিল্প। এতে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়বে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সমৃদ্ধ হবে জেলার পর্যটন খাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারোবাজারের প্রত্নসম্পদগুলো দেশের অন্যতম বৃহৎ মধ্যযুগীয় প্রত্ননগরীর নিদর্শন। পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা পরিচালনা করা হলে এখান থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নিদর্শন উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু গবেষণা ও খনন কার্যক্রম সীমিত থাকায় এখনো অনেক ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রতিটি স্থাপনার বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ,নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তথ্যফলক স্থাপন,পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন,’এসব স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার,নিয়মিত তদারকি এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অযত্নে পড়ে থাকলে একসময় এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন,’হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
‘ছবি সংগৃহীত।


