বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু ,কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে অবস্থিত পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা খালাসকারী লাইটারেজ জাহাজগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর ও অপ্রতিরোধ্য অপরাধের সম্রাজ্য। পণ্যবাহী জাহাজের ক্রু ও নাবিকদের তীরে আনা-নেওয়ার আড়ালে প্রতিদিন চলছে লাখ লাখ টাকার চোরাই জ্বালানি তেলের কারবার। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চোরাই তেল সংগ্রহের জোগান দিতে গিয়ে জাহাজের মাদকাসক্ত ক্রুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবাসহ মারাত্মক সব মাদকের বড় বড় চালান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই শক্তিশালী চোরাচালানি চক্রটি রীতিমতো দাপট দেখিয়ে সরকারি খাস জমি দখল করে একাধিক অবৈধ স্থাপনা ও বাণিজ্যের মূল আস্তানা গড়ে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না, এমনকি সত্য প্রকাশ রুখতে নির্দিষ্ট এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে অপরাধীরা।
দীর্ঘ এক মাসের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে এই চক্রের অভিনব পন্থায় তেল চুরির রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সদস্যরা লোক দেখানোর জন্য ফাইবার বোট নিয়ে জাহাজের নাবিকদের পারাপার করে। তবে এই বোটগুলোর ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে গোপন তেলের চেম্বার বা আলাদা কক্ষ। জাহাজ থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে হাজার হাজার লিটার তেল এই গোপন চেম্বারে পাম্প করে তীরে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে সেই তেল ড্রাম ও ব্যারেলে ভর্তি করে বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয়।
সিন্ডিকেটের ভেতরের একটি সূত্র জানায়, লাইটারেজ জাহাজের অনেক ক্রু মাদকাসক্ত হওয়ায় তারা শুধু টাকার বিনিময়ে তেল বিক্রি করতে চায় না। ফলে চোরাকারবারিরা প্রথমে স্থলপথ থেকে ইয়াবার চালান সংগ্রহ করে জাহাজে পাঠায়। মাদকের বিনিময়ে জাহাজ থেকে মাত্র ৭০-৮০ টাকা লিটার দরে অপরিশোধিত তেল নামিয়ে আনা হয়, যা পরবর্তীতে স্থানীয় বাজারে ১০০ টাকা বা তারও বেশি মূল্যে বিক্রি করা হয়।
মাঝেমধ্যে স্থলপথে পুলিশ চোরাই তেলের চালান জব্দ করলেও চক্রটি সুকৌশলে পার পেয়ে যায়। তারা আগে থেকে তৈরি করে রাখা জালিয়াতি বা নকল নথিপত্র প্রদর্শন করে চোরাই তেলকে ‘বৈধ’ দাবি করে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এছাড়া আইনি ঝামেলা ও তল্লাশি এড়াতে স্থানীয় এক রাজনৈতিক প্রভাবশালীর মধ্যস্থতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে মোটা অঙ্কের মাসিক চুক্তির (মাসোহারা) বিনিময়ে এই রমরমা কালোবাজারি টিকিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পায়রা সমুদ্র বন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শরীফ এই বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর উল্লেখ করে বলেন, “বন্দর সীমানার ভেতরে যেকোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড রুখতে কোস্টগার্ডের টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। একই সাথে বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বের সাথে অবহিত করা হচ্ছে।”
সরকারি জমি দখলের বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, সরকারি খাস জমিতে চোরাকারবারিদের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুতই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম মাসোহারার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য দাবি করে বলেন, “নদীপথের এই বিষয়গুলো মূলত নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের এখতিয়ারভুক্ত। তবে আমাদের থানা পুলিশ ইতিপূর্বে বেশ কিছু তেলের চালান জব্দ করেছিল, যা পরবর্তীতে মালিকপক্ষ আদালতের মাধ্যমে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। অপরাধীদের সাথে পুলিশের কোনো আপস নেই।” ছবি সংগৃহীত।

