স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
“আজ ১২টা দিন পার হয়ে গেল, আমার ভাইটা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে—প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা এখনো কোনো জবাব পাইনি। প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগেও একটা জলজ্যান্ত মানুষ এভাবে হাওয়া হয়ে গেল?”— চোখে জল আর বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী এমরান আলী মাস্টার।
গত ২০ জুন বিকেল থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার গোপীকান্তপুর গ্রামের মেহনতি কৃষক হারুনার রশিদের (৪৬) খোঁজে আজ বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে তাঁর পরিবার। ১২ দিনেও ভাইয়ের কোনো হদিস না পেয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিখোঁজের বড় ভাই এমরান আলী।
এদিকে এই চাঞ্চল্যকর অন্তর্ধানের বিষয়ে যশোর র্যাব-৬ এর অধিনায়ক মেজর এ.টি.এম ফজলে রাব্বী প্রিন্স এ প্রতিবেদককে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, “গত তিন দিন আগে এই মামলাটির নথিপত্র আমরা হাতে পেয়েছি। ইতিমধ্যে আমাদের পক্ষ থেকে অধিকতর ও নিবিড় তদন্ত শুরু হয়েছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করা যাচ্ছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই নিখোঁজ রহস্যের জট খোলা সম্ভব হবে।”
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কেশবপুরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন হারুনার রশিদ। যাওয়ার সময় তিনি পরিবারকে বলে যান, সন্ধ্যার পরপরই ঘরে ফিরবেন। কিন্তু সেই সন্ধ্যা আর কাটেনি। পরিবারের দাবি, পাওনা টাকা তোলার কথা বলে তিনি বাড়ি ছাড়লেও তাঁর স্ত্রী জানান, বাজারে থাকা অবস্থায় রহস্যময় একটি ফোন কল পাওয়ার পরই হারুনার তড়িঘড়ি করে চলে যান এবং এরপর থেকেই তাঁর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়ে পরদিন ২১ জুন মণিরামপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় ট্র্যাকিং করে জানতে পেরেছে— নিখোঁজ হওয়ার পর হারুনার রশিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সিমটি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার জুইখালী কামারালী সীমান্তের দিকে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ ও স্বজনরা কলারোয়ায় গিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজলেও কোনো ক্লু মেলেনি। এদিকে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ একজনকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভাইয়ের দ্রুত সন্ধান চান এমরান আলী।
নিখোঁজ হারুনার রশিদ ছিলেন তাঁর পুরো পরিবারের একমাত্র হাল ধরা মানুষ। তাঁর পরিবারে রয়েছে স্ত্রী, এক বিবাহিত মেয়ে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছোট মেয়ে এবং মাত্র ৪ বছর বয়সী এক অবুঝ পুত্রসন্তান। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি নিখোঁজ থাকায় মাত্র ১২ দিনেই পরিবারটি চরম মানবিক ও ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
বাবার ফেরার পথ চেয়ে দরজায় চোখ রেখে বসে আছে অবুঝ সন্তানরা। সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের শীর্ষ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। তবে মামলার তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তরের পর এবং খোদ র্যাব অধিনায়কের ইতিবাচক আশ্বাসে এখন শেষ আশার আলো দেখছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। ছবি সংগৃহীত।

