রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে:
সরকারি নিয়ম ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বনজ দ্রব্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য ‘ট্রান্সপোর্ট পারমিশন’ (টিপি) বা ট্রানজিট পাস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ঝিনাইদহ জেলা বন বিভাগে এই ফ্রি পাসের নামেই চলছে লাখ লাখ টাকার প্রকাশ্য বখরা ও চাঁদাবাজি। ভুক্তভোগী সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও কাঠ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিটি পাসের জন্য গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অবৈধ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগের এক শ্রেণির শীর্ষস্থানীয় ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সেল্টার ও যোগসাজশে জেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য দুর্নীতির সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ঝিনাইদহ জেলায় এই পুরো অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াটি সরাসরি মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথা ফরেস্টার জাকির হোসেন এবং ফরেস্ট গার্ড দিপু বিশ্বাস। কাঠ ও বনজ দ্রব্য পরিবহনের জন্য পাস দেওয়ার নামে প্রতিটি বড়-ছোট গাড়ি থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বুক ফুলিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। স্থানীয় সূত্র ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঝিনাইদহ জেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি বনজ দ্রব্যবাহী ট্রাক ও লরি বিভিন্ন জেলা ও গন্তব্যে চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ি থেকে এভাবে অভিনব কায়দায় টাকা আদায় করায় মাস শেষে এই সিন্ডিকেটের পকেটে শুধু ট্রানজিট পাস বাবদই ঢুকছে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পক্ষে ঝিনাইদহ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার জাকির হোসেন ট্রান্সপোর্ট পারমিশনের স্লিপে মূল স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা। কিন্তু ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে তার কার্যালয়ের একাধিক লাইসেন্স মুড়ি বইতে (কাউন্টারফয়েল) নাম, গাড়ির নম্বর এবং তারিখের জায়গা সম্পূর্ণ ফাঁকা রেখেই অগ্রিম স্বাক্ষর করে রাখা হয়েছে। এই ফাঁকা ও অবৈধ কাগজগুলোই পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ে ফরেস্ট গার্ড দিপু বিশ্বাসের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে কাঠ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে।
শহিদুল ইসলাম নামে এক স্থানীয় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে বলেন, “যশোর অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অমিতা মণ্ডলের সরাসরি ছত্রছায়ায় এবং বড় অঙ্কের গোপন আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সমস্ত নিয়ম ভেঙে ফরেস্টার জাকির এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে পুরো জেলায় বন বিভাগের মূল কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং দুর্নীতির ডালপালা চারদিকে বিস্তার লাভ করেছে।”
শুধুমাত্র টিপি বা ট্রানজিট পাস বাণিজ্যই নয়, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যাঙের ছাতার মতো লাইসেন্সবিহীন অবৈধ করাত কল (স মিল) থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় এবং শত কিলোমিটার সরকারি বনায়ন কর্মসূচীতেও ব্যাপক অনিয়মের অকাট্য অভিযোগ রয়েছে। কাগজে-কলমে বিপুল সংখ্যক দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে অতি স্বল্প শ্রমিক দিয়ে নামমাত্র কাজ করিয়ে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের সিংহভাগ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। ভুক্তভোগী কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “বন বিভাগের এমন প্রকাশ্য স্বেচ্ছাচারিতা, সিন্ডিকেটবাজি ও অন্যায্য হয়রানির কারণে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে না পেরে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছি।”
এদিকে দুর্নীতির এতসব অকাট্য প্রমাণ সামনে থাকা সত্ত্বেও ঝিনাইদহ জেলা বন বিভাগের অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার জাকির হোসেন সমস্ত অনিয়ম অস্বীকার করে উল্টো এই প্রতিবেদককে মুখ বন্ধ রাখতে ঘুষের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “এসব নিউজ নিয়ে লেখালেখির কি দরকার ভাই? আমি আপনি সকলের বাড়িই তো এই ঝিনাইদহে। আপনার খরচ-খরচা বা পারসোনাল লাগলে বলেন, দিয়ে দিচ্ছি।”
এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঝিনাইদহের সহকারী বন সংরক্ষক মোছাঃ জুমুয়া জামান নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি এই অফিসে একদম নতুন যোগদান করেছি। তাই পূর্বের বা বর্তমানের এই অভিযোগগুলোর বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারবো।”
যোগাযোগ করা হলে যশোর অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক হারুন অর-রশিদ স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় বলেন, “সরকারি সেবায় কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তবে এই সিন্ডিকেটের মূল আশ্রয়দাতা হিসেবে অভিযুক্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অমিতা মণ্ডল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে বা সাংবাদিকদের সামনে মুখ খুলতে সম্পূর্ণ রাজি হননি। ঝিনাইদহের সচেতন মহলের দাবি, বনজ সম্পদ রক্ষা ও সুশাসন ফেরাতে অবিলম্বে এই জাকির-দিপু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। ছবি সংগৃহীত।

