স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
পারিবারিক অভিমানে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা দুই অবুঝ শিশুকে সুকৌশলে অপহরণ ও বিভিন্ন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে জঘন্য ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় বাধ্য করার অভিযোগে এক ধুরন্ধর প্রতারককে হাতেনাতে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় ওই প্রতারকের নারকীয় জিম্মাদশা থেকে ১২ বছর বয়সী দুটি ফুটফুটে শিশুকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন স্থানীয় জনতা ও কেশবপুর থানা পুলিশ। আজ বুধবার (২৪ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কেশবপুর পৌরসভার ভোগতী নরেন্দ্রপুর (ভবানীপুর) গ্রামের এক নির্জন এলাকায় এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। আটককৃত প্রতারক ও মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য মাসুম বিল্লাহ (৩৫) কেশবপুর উপজেলার বায়সা এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া দুই শিশু হলো— বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার টাউন নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইয়ামিন হোসেন (১২) ও তার আপন চাচাতো ভাই সারাফাত ইসলাম নোমান (১২)। গত ২২ জুন পারিবারিক সামান্য ভুল বোঝাবুঝি ও অভিমানে বাড়ি থেকে কাউকে না জানিয়ে গোপনে বের হয়ে আসে তারা। এরপর ট্রেনযোগে তারা খুলনা রেলস্টেশনে এসে পৌঁছালে সম্পূর্ণ একা ও অসহায় অবস্থায় প্লাটফর্মে বসেছিল। ঠিক তখনই তাদের ওপর নজর পড়ে কেশবপুরের ধুরন্ধর মাসুম বিল্লাহর। সে নিজেকে বড় দানবীর সাজিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক প্রলোভন ও ভালো কাজ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নিষ্পাপ শিশু দুটিকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সোজা কেশবপুরে নিয়ে আসে।
অভিযোগে প্রকাশ, কেশবপুরে এনে মাসুম বিল্লাহ শিশু দুটিকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে উপজেলা সদরের একটি মসজিদের পরিত্যক্ত ভবনের ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখে। এরপর প্রতিদিন সকাল হলেই সে শিশু দুটিকে বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে যেত এবং স্থানীয় নামী মসজিদ ও মাদ্রাসার ভুয়া রসিদ বই এবং ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে নগদ টাকা, চালসহ বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সামগ্রী ও চাঁদা সংগ্রহে বাধ্য করত। মূলত শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মাসুম বিল্লাহ নিজে বসে বসে ভিক্ষাবৃত্তির বিশাল বাণিজ্য ফেঁদে বসেছিল।
আজ বুধবার বিকেলে কেশবপুর পৌরসভার ভবানীপুর এলাকায় জনৈক আব্দুল হামিদের বাড়ির সামনে শিশু দুটিকে রসিদ হাতে ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে দেখে স্থানীয় সচেতন যুবকদের মনে তীব্র খটকা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তারা শিশু দুটিকে ডেকে এনে স্নেহের সাথে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে বড়দের ভালোবাসা পেয়ে দুই শিশু কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং খুলনা রেলস্টেশন থেকে অপহরণের পর মাসুম বিল্লাহর মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়ার পুরো লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দেয়। এই সত্য জানতে পেরে উত্তেজিত গ্রামবাসী চারদিক থেকে ধাওয়া করে প্রতারক মাসুম বিল্লাহকে একটি গাছের সাথে বেঁধে গণপিটুনি দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে কেশবপুর থানা পুলিশকে অবহিত করে। খবর পাওয়া মাত্রই থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশু দুটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ হেফাজতে নেয় এবং গণধোলাইয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে মাসুম বিল্লাহকে হাতকড়া পরিয়ে সরাসরি থানায় নিয়ে আসে।
সফল এই শিশু উদ্ধার ও আসামি আটকের বিষয়ে কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকসানা খাতুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া শিশুদের আমরা পরম যত্নে থানা হেফাজতে রেখেছি। ইতিমধ্যেই বাগেরহাটের ফকিরহাটে তাদের প্রকৃত পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করে শুভ সংবাদটি দেওয়া হয়েছে। তারা সন্তানদের নিতে কেশবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। অন্যদিকে, শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি করানো এবং মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকায় আটককৃত মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে শিশু আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত কঠোর মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া পুরোদমে সচল রয়েছে। এই চক্রের পেছনে অন্য কোনো বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তাও আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।’ ছবি সংগৃহীত।

