উচ্ছেদ আতঙ্কের মাঝেও মানবিকতার অনন্য নজির

উচ্ছেদ আতঙ্কের মাঝেও মানবিকতার অনন্য নজির

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ , কলাপাড়া :
কলাপাড়ায় পায়রা বন্দর কর্তৃক রাস্তা নির্মাণে উচ্ছেদ আতঙ্কগ্রস্ত জিয়া কলোনীর ভূমিহীন পরিবারের পক্ষ থেকে পায়রা বন্দরের চেয়ারম্যানকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
রবিবার (২৪ মে) বেলা ১১টার দিকে কলাপাড়ায় উচ্ছেদ আতঙ্কগ্রস্ত জিয়া কলোনীর ভূমিহীন পরিবারের সদস্যরা ঈদ কার্ডের মাধ্যমে পায়রা বন্দর চেয়ারম্যানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এই সময়ে পায়রা বন্দরের গেটে ভূমিহীন পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ শতাধিক ব্যাক্তি উপস্থিত ছিলেন। পায়রা বন্দরের চেয়ারম্যানের পক্ষে থেকে চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব মুঃ আহসান হাবীব এই ঈদ কার্ডটি গ্রহণ করেন।
পায়রা বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের পাশে ইটবাড়িয়া গ্রামে বেড়িবাঁধের ঢালে জিয়া কলোনীর ভূমিহীন পরিবারগুলো বসবাস করে। বাস্তুভিটাহীন হওয়ার কারণে ২০০৪ সালে তৎকালীন সরকার আন্ধারমানিক নদীর পাড়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ঢালে পরিবারগুলোকে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিল। তখন জঙ্গল সাফ করে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাস করে আসছে। বেড়িবাঁধের বাইরের দিকে বসবাস করার ফলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। তারপরও মাছ ধরে, ইট ভাটায় কাজ করে, নির্মাণ শ্রমিক এবং কৃষি শ্রমিক হিসাবে কাজ করে বিভিন্ন টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে জীবন যাপন করছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৩ সালে এই বেড়িবাঁধের উপর প্রশস্থ রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তখন থেকে পরিবারগুলো উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর সময়ে জিয়া কলোনীর ভূমিহীন পরিবারের সদস্য লাইলী সাংবাদিকদের কাছে বলেন, আমরা পায়রা বন্দরের সবচেয়ে কাছের মানুষ। বন্দরের বিল্ডিং এর পাশের বাঁধের উপরে আমরা বসবাস করি। আমাদেরকে যে কোন সময়ে উচ্ছেদ করা হতে পারে। তাই এই ঈদে আমরা (পায়রা বন্দর) চেয়ারম্যানকে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত জানাইছি।
মোঃ ফোরকান হাওলাদার বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছি। আজকে বন্দর চেয়ারম্যানকে ঈদের দাওয়াত দিতে এসেছি। ঈদের দিনে তিনি যদি একবার আমাদের কলোনী দেখতে আসেন তাহলেই আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন।”
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রথম টার্মিনাল থেকে টিয়াখালীতে প্রশাসনিক ভবন সাথে যুক্ত হওয়ার বিকল্প সড়ক হিসাবে পায়রা বন্দরের গেট থেকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু পর্যন্ত বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে সাড়ে পাঁচ কিঃমিঃ রাস্তা নির্মাণ করার কাজ শুরু করেছে। এই রাস্তা নির্মাণের জন্য জিয়া কলোনীসহ বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাসকারী আনুমানিক ১৩৬টি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে। এই পরিবারগুলো যেখানে বসবাস করে সেই জমির মালিক বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড তাই উচ্ছেদ করা হলেও কোন ধরনের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন করা হবে না বলে জানা যায়।
পায়রা বন্দরের জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্থ ৩,৪২৩ টি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। কিন্তু জিয়া কলোনীর ভূমিহীন পরিবারগুলোর জন্য কোন ধরনের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ অথবা সহযোগীতা করা হচ্ছে না। ফলে সরকার ঘোষিত ভূমিহীন মুক্ত কলাপাড়ায় এই পরিবারগুলো নতুন করে বাস্তুভিটাহীন হতে যাচ্ছি। আমাদের প্রশ্ন হলো, নিজস্ব জমিতে বসবাসকারী পরিবারর জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অথচ ভূমিহীন পরিবার কিন্তু আমাদেরকে উচ্ছেদ করা হলেও কোন পুনর্বাসন দেওয়া হচ্ছে না।
শাহানা বেগম বলেন, “সরকারের প্রয়োজন হলে রাস্তা করবে তাতে আমাদের কোন অসুবিধা নাই কিন্তু আমরা যারা রাস্তার পাশে ভূমিহীন আছি আমাদের মাথা গোজার ঠাইটুকু সরকার করে দিক। আমরা কোনো চাকরি, ক্ষতিপুরন, অন্য যে কোন সুবিধা চাই না শুধু আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে মাথা গোজার স্থান চাই। তাই অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য পরিবাররের মতো আমাদেরকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হোক।”
ভূমিহীন পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকদের আরো বলেন যে, উল্লেখিত রাস্তাটির পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত কিনা আপনারা অনুসন্ধান করে দেখবেন। আপনাদের মাধ্যমে আমরা সামগ্রিক বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবী জানাচ্ছি। সেই সাথে নদী তীর এবং খাস জমির দখলের উদ্দেশ্যে এই রাস্তা করা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা প্রয়োজন এবং প্রকৃত সত্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *