নিজস্ব প্রতিবেদক, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ):
সরকারি চাকরিতে ৩ বছর পর পর বাধ্যতামূলক বদলির স্পষ্ট ও লিখিত আইনি নীতিমালা থাকলেও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়ে যেন কোনো নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। কোনো এক শক্তিশালী ‘অদৃশ্য খুঁটির’ জোরে বিগত ৭ বছর ধরে একই আকর্ষণীয় কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছেন কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) যুথিকা বিশ্বাস। দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার আঁকড়ে থাকার সুবাদে তিনি এই সরকারি অফিসটিতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব একচ্ছত্র কালো সিন্ডিকেট। তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার, বহিরাগতদের দিয়ে সরকারি নথি নিয়ন্ত্রণ এবং ফাইল আটকে কোটি টাকার ‘ফাইল বাণিজ্যের’ পাহাড়সম গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুথিকা বিশ্বাস ১৯৯৯ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ২০১৫ সালে কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রথম পোস্টিং পাওয়ার পর ২০১৭ সালে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে পার্শ্ববর্তী কোটচাঁদপুর উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও অদৃশ্য তদবিরের জোরে মাত্র ছয় মাস পরেই আবার রাজকীয়ভাবে পূর্বের কর্মস্থল কালীগঞ্জেই ফিরে আসেন তিনি। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এখানেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেন। সেই থেকে আজ অবধি প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা তাঁকে এই আসন থেকে এক ইঞ্চিও নাড়াতে পারেননি।
অভিযোগ রয়েছে, দাপ্তরিক ফাইলের মূল চাবিকাঠি নিজের কুক্ষিগত করে রেখে যুথিকা বিশ্বাস ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। সরকারি নিয়োগ বিধিমালাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি প্রভাব খাটিয়ে তাঁর নিজের গ্রাম মহাদেবপুরের তিনজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরে মাস্টাররোলে (দৈনিক মজুরি) চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, কোনো প্রকার সরকারি নিয়োগপত্র ছাড়াই অমিত বিশ্বাস নামের এক বহিরাগত যুবককে প্রতিদিন ইউএনও অফিসের অত্যন্ত সংবেদনশীল, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও কম্পিউটারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া যুথিকা বিশ্বাসের প্রভাবে তাঁর একই গ্রামের সুবোদ বিশ্বাসকে সরাসরি ইউএনওর ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং অলিভ বিশ্বাসকে উপজেলা মৎস্য অফিসে মাস্টাররোলে চালকের আসনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই নারী কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ ও অস্বাভাবিক বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অকাট্য তথ্য মিলেছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ৫ বছরে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতেই প্রায় ৬৪ লাখ টাকার নিরেট লেনদেন হয়েছে। অথচ এই ৫ বছরে সরকারি স্কেল ও নিয়ম অনুযায়ী তাঁর প্রকৃত বেতন ও ভাতা বাবদ মোট বৈধ প্রাপ্তি ছিল মাত্র ২৩ লাখ টাকা। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ— বিবিধ ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা, বিভিন্ন সরকারি অনুদান ও প্রকল্প বরাদ্দ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন কাটা এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন তিনি।
দুর্নীতি ও অনিয়মের এই বিশাল পাহাড় সামনে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা যুথিকা বিশ্বাস সম্পূর্ণ নির্বিকার। সমস্ত অন্যায়ের দায় অস্বীকার করে তিনি গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের (মাস্টাররোল) নিয়োগ দিয়েছেন, আমি এই ক্ষুদ্র কর্মকর্তা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আর বদলির বিষয়টি সম্পূর্ণ উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এখতিয়ার, এখানে আমার কোনো হাত নেই।”
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝিনাইদহ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রথীন্দ্রনাথ রায় জানান, “এই স্তরের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের মূল বিষয়টি সরাসরি খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে একজন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় একই স্থানে থাকা এবং তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত এতগুলো অনিয়মের বিষয়ে আমরা দ্রুত তদন্তের জন্য যথাস্থানে ও বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে লিখিতভাবে জানাবো।”
কালীগঞ্জের স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও সুশীল মহলের দাবি, সরকারি দপ্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং প্রশাসনের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতি চিরতরে থামাতে অবিলম্বে যুথিকা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরসহ দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ছবি সংগৃহীত।


